কবিতা
-
থাকা না-থাকার শূন্যতা পার হয়ে
নদী মরে গেলে থেকে যায় তার সামান্য কিছু রেখা সেখানেই নদী, স্মৃতি খুঁজে পাই। শুধু মানুষ রাখে না, বিস্মরণেই মুছে যায় একা একা যেন বালিয়াড়ি খাঁ-খাঁ শূন্যতা, জোছনায় জ্বলে ধু-ধু! এই ধারণার বিপরীতে এই পৃথিবীতে কেউ কেউ রেখে যায় স্মৃতি-বিস্মৃতিময় স্মরণের কত কিছু নদী মরে গেলে মুছে যায় জানি ছোট বড় সব ঢেউ কিছু মানুষের…
-
যে-আলো অন্ধকার হয় না
বোদলেয়ার কিংবা সঞ্চয়িতার পাতা ওড়াউড়িতে মধ্যরাতের নক্ষত্র নিভে যাওয়া বিপন্ন সময়ের, অনির্বাণ প্রতিদ্বন্দ্বী ‘উজ্জ্বল উদ্ধারে’ – আপনাকে মনে পড়ে খুব মন পোড়ে, হঠাৎ তীক্ষè অন্ধকার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে আপনার আর কোথাও না-থাকার নিরীহ ধুলোপথ শেষে ফিরে না-আসা ভ্রমণ সর্বনাশের শেষ শব্দ – মৃত্যু যার শেষে ব্যাকরণ দাবি করে না কোনো বিরাম চিহ্ন। জলের মতো…
-
কিছু কিছু মানুষ
কিছু কিছু মানুষ আছে আলো জ্বালাতে আসেন একা একটি প্রদীপ হাতে অসংখ্য প্রদীপ প্রজ্বালনে উৎসাহ জোগাতে আসেন, স্তূপ স্তূপ অন্ধকারে নিমজ্জিত গাঁয়ের প্রান্তে কুঁড়েঘরে মাটির প্রদীপে সলতে হতে আসেন দূর নক্ষত্রের আলো হয়ে অরুন্ধতীর দ্যুতি হতে আসেন, মানবতার প্রহরী হয়ে ঘরে ঘরে মানব চিন্তক হতে আসেন; নিভৃতে গানের পাখি হয়ে দাঁতাল আঁধারের বিরুদ্ধে গিয়ে মানব…
-
আত্মস্থ সরলরেখায়
অসুন্দর সরলরেখায় আপনি কখনো ছিলেন না বিন্দু থেকে সরলরেখায় কোনো জটিলতা নেই আপনার সমুদ্র থেকে অনায়াসে আমরা পেতাম মধুর নির্যাস আলোকের ঝর্নাধারায় নিজেকে চিনতে গিয়ে যখন খুঁজে ফিরি নানা জিজ্ঞাসা বিন্দু থেকে সরলরেখায় দাগ পড়ে গিয়ে আলোকের বিপরীতে অর্ধসত্য জনারণ্যে ঘোরে তখন আপনি এসে বিভাজিত সরলরেখাটি উল্টে দিয়ে স্পষ্ট করে তুলে বলে দেন – এইবার…
-
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
দূরগামী উড়োজাহাজের ভেতর সময় এবং ঘুম ঘনিয়ে আসে আর স্বপ্নরা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় কথায় কবিতায় পৃথিবীর মানে শুধু মাটি নয় পানি নয় হাওয়া নয় অপার অনিকেত শূন্যতাও নয় অনাত্মীয় প্রতিবেশী বেদনাকে আশৈশব চিনি আমি অভিন্ন নদীর টানে মানুষ যেখানে মানুষের হয়ে কথা বলে বসুধায় সেখানে আমার গ্রাম সেই গাঁয়ে একবার অতিথি হয়ে আসেন সৈয়দ…
-
শেকড়
এই দেশ এই বনভূমি এই নদী এই সংগীত চিরদিন আমাদের ছিল প্রিয় ভাষা? সে তো মায়ের ভাষা! চিবুকের রেখা বরাবর সবকিছু স্বাভাবিক ছিল! যেদিন থেকে বিশ্বাস আলাদা হলো ভালোবাসা বেঁকেচুরে চিরসত্য জীবনের মায়া মৃত্যু এসে নিয়ে গেল, জ্ঞান ও যাপন সেই থেকে বুঝেছি, আলগা হতে থাকে শেকড়। নিয়তি হাঁটু মুড়ে বসে পাশ ঘেঁষে সংঘবদ্ধতার থেকে…
-
অধরা জীবন
তোমার চলে যাবার পর কি সকল ফুল নিয়েছে ছুটি – গন্ধ বিলাবে না বলে? আলোকারণ্যে সঘন বাতাস, আলো কি নিভে যাবে অনন্য পার্বণের কালে? তোমাকে দেখতে এসেছিল সারাদিনের বিভোর বর্ষণ অগত্যা চাঁদ উঠেছিল যামিনী ছাপিয়ে আর প্রভাতসূর্য উঁকি দিতে দিতে বিদ্ধ করেছিল তোমার সুদীর্ঘ নিবাস যখন নদীদের আয়ু কমতে কমতে ঊরুও স্পর্শ করে না মহোৎসব…
-
অভিধান
স্ত্রীকে ওষুধ খাওয়াবেন বলে ঠিক সাড়ে ন’টায় বেরিয়ে যাচ্ছেন যে-কোনো আয়োজন থেকে যে-কোনো কাজের সময় নিয়ন্ত্রিত নক্ষত্রের আচরণে বাঁধা হাসি নিমীলিত হাত পকেটে কিংবা আতরে রেখে হাঁটছেন মৃদু লয়ে ভাবছেন কি-না কিছু না-কি পথের গোলাপ তুলে পাপড়িসমূহ ছড়াচ্ছেন প্রজন্মের করতলে বিহ্বল শিক্ষক সমস্ত রাতের পাতায় চোখ রেখে পাঠে নিচ্ছেন প্রাত্যহিক বিশ্বজগৎ পাতা ও পুঁতির বুননে…
-
প্রশ্নান্তরে
জীবন থেকে পালিয়ে কত দূর যাওয়া যায়? ওইখানে, ঘটে কি আবির্ভাব কোনো মোহন দৃশ্যের? নিরালায় কখানো কি বাজে লোকান্তরের গান – বিশ্রুত সুরে? পেয়েছ কি তবে প্রান্তরব্যাপী শ্রেণিকক্ষের খোঁজ? তাহলে কোথায় দিয়েছ ডুব? কোন অদেখা ভুবনের আলো মেখে নিচ্ছ গায়ে? এখানে, ফিসফাস করে আনমনা হেমন্তের হাওয়া ইতস্তত জ্বলে ওঠে গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতির জোনাকি অনন্ত অভিমানে…
-
দিনশেষে
দিনশেষে ঘাসি নৌকা সব ঘরে ফিরে যায় সার বেঁধে নদীতে তখন জোয়ারের টান পাথরের খোয়াই পার হয়ে দু’পাশে বৃক্ষর সারি – বর্ষীয়ান বৃক্ষর হলুদ পাতারা ঝরে টুপটাপ সন্ধ্যার নিরাক অাঁধারে। পুরনো গন্ধে ভরা হাওয়ার ভেতরে পাঠায় কে চিরকুট – চলে যাওয়ার দিন এসে পড়ে। চলে আয়োজন। শ্রাবণের উড়ুক্কু মেঘের সওয়ারি কে চলে যায় সময়ের চিহ্নিত…
-
জেনে যেতে পারো
জেনে যেতে পারো একদিন নিসর্গের সৌন্দর্যে আমিও অভিভূত হয়েছিলাম কত আকাশ ও নক্ষত্র দেখে, জেনেছিলাম মানুষ আঙুলের সদ্ব্যবহারে জল, মাটি ও আলোর স্পর্শে তারাফুল ফুটিয়েছিল; জল দিয়েছিল গাছে – মাটিতে উৎপাদিত শস্যের দৃশ্য মানুষের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে সে-নিসর্গের যোগ্য হয়ে ওঠে; জেনে যেতে পারো, বৃক্ষের সান্নিধ্যে মানুষ সৃজনশীল হয়েছিল – দেখে যেতে পারো এই…
-
না, কোনো এলিজি নয়
(বনানীর গোরস্তানে আফতাব শেষ ঘুমে চলে গেলে) আপনাকে কবরে শুইয়ে দেওয়ার পর আপনাকে নিয়ে কবিতা লেখার কোনো মানেই হয় না। আজ রাত থেকে আপনার কোনো বন্ধু নেই, পরিবার নেই, দায় নেই, দয়া ও মমতা আপনার চারপাশ ঘুরঘুর করলেও আর স্পর্শ করতে পারবে না কিছুতেই। হ্যাঁ মশাই, আপনাকে। আপনার স্পর্শ পাওয়া ল্যাপটপ, কিন্ডেল, সেলফোন, আইপ্যাড –…
