February-March 2021
-

পাঠপরিক্রমণ থেকে লেখালেখির মিলিত ঐকতান
হেমন্তবালা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমার জীবনটা তিন ভাগে বিভক্ত – কাজে, বাজে কাজে এবং অকাজে।’ বিষয়টি তিনি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, ‘কাজের দিকে আছে ইস্কুলমাস্টারি, লেখা, বিশ্বভারতী ইত্যাদি, এইটে হলো কর্তব্য বিভাগ। তার পরে আছে অনাবশ্যক বিভাগ। এইখানে যতকিছু নেশার সরঞ্জাম। কাব্য, গান এবং ছবি।’ (১৪ জুন, ১৯৩১) অনেকটা একই সূত্র ধরে…
-

অনন্য রাবেয়া খাতুন
আশফাক খান রাবেয়া খাতুন – শক্তিশালী ও সাহসী কথাসাহিত্যিক, শুধু এ-পরিচয়ই যথেষ্ট তাঁর জন্য, আর কোনো বিশেষণের বিশেষ প্রয়োজন নেই। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও তৎপরবর্তী দশকসমূহে বাংলা সাহিত্যকে পরম নিষ্ঠা ও সাধনায় যাঁরা সমৃদ্ধ করে তুলেছেন তাঁদের অন্যতম তিনি। লিখেছেন দু-হাত খুলে – উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথা – সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় রয়েছে…
-

মকবুলা মনজুরের জীবনকালের মন্দিরা
মকবুলা মনজুর (১৯৩৮-২০২০) আমাদের কথাসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক। শক্তিশালী লেখক হয়েও তিনি এ-সময়ে তেমন পাদপ্রদীপের আলোয় আসেননি। কোনোদিন প্রচারও চাননি। প্রচারবিমুখ এ-লেখক গল্প-উপন্যাস মিলে একটা সময়ধারায় নিছক কম লেখেননি। তাঁর লেখালেখির কিছু উদাহরণ : আর এক জীবন (১৯৬৮), জলরং ছবি (১৯৮৪), অবসন্ন গান (১৯৮২), বৈশাখে শীর্ণ নদী (১৯৮৩), আত্মজ ও আমরা (১৯৮৮), অচেনা নক্ষত্র (১৯৯০), পতিতা…
-

মাটি হারে না!
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমার শ্রদ্ধেয় কবি অসীম সাহা বাংলা একাডেমির পাশেই একটা কলোনিতে সাবলেট নিয়ে থাকতেন। আজ চাকরি আছে তো কাল নেই। আমরা দুয়েকজন, আরশাদ আজিজ, আমি বা আর কেউ সেই ছোট ঘরে আড্ডা দিতে যাই। অঞ্জনা বউদি ছোট ছোট কাপে চা দেন, সঙ্গে মুড়ি, পেঁয়াজ, মরিচ, তেল দিয়ে মাখা। এ সময়টায় অসীমদা ভীষণ…
-

ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খানের চিরবিদায় : উচ্চাঙ্গ সংগীতাকাশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন
পৃথিবীতে আসা-যাওয়ার চিরন্তন সত্যকে মেনে নিয়ে আমাদের পথ চলতে হয়। সাম্প্রতিককালে ‘না ফেরার দেশে’ শব্দসমষ্টি ব্যবহারের আধিক্য লক্ষ করা যায়। কারো মৃত্যু হলে এই শব্দসমষ্টির ব্যবহার লক্ষণীয়। সত্যিকার অর্থে এমন কোনো দেশ আছে কি না যেখানে কেবল বিদেহী আত্মারা বসবাস করে তা কেউ বলতে পারে না। আত্মা অবিনশ্বর – এ-কথা সবাই জানেন। মৃত্যুর পরে কোথায়…
-

আমার হাতে একটা সুই বিঁধেছিল
কী কুক্ষণেই যে কাজটা করতে গিয়েছিলাম আমি! অফিসে যাওয়ার মুহূর্তে আবিষ্কার করলাম আমার শার্টের একটা বোতাম ছেঁড়া। বাড়তি বোতাম শার্টের সাইডে লাগানো আছে, ওটা খুলে নিয়ে বুকের কাছে স্থাপন করতে হবে। এজন্য সুই-সুতো প্রয়োজন। কাজটা অত সহজ নয় ভেবে আমি মীরার শরণাপন্ন হতে চাইলাম। রান্নাঘরে গিয়ে দেখা গেল, মীরা এক হাতে রন্ধনশিল্পের বই ধরে অন্য…
-

‘বাবা, নিচু হও’
আমি কিছু কথা বলতে চাই। আর সেটা হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা। আপনারা হয়তো বলবেন, এতদিন বাদে আবার এখন মুক্তিযুদ্ধের কথা হচ্ছে কেন, সেসব তো এই ৫০ বছরে অনেক বলা হয়েছে। তার উত্তরে আমি বলতে চাই, না, এখনো সব বলা হয়নি। এবং আমার ধারণায় এক হাজার বছরেও সব বলা হবে কি না, সন্দেহ। কারণ এ ছিল…
-

কোভিড ১৯-এ কবি ও অকবি
শুনেই চমকে ঘাড় ফেরালেন শিবেন্দু করগুপ্ত। ‘আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে, সুয্যি গেছে পাটে’। বাঃ! পরের লাইনটা? মনে আছে? বলো দেখি! পাল্লায় খদ্দেরের ঝিঙে মাপতে মাপতে লোকটার মাথা কাত। ঠোঁটে সলজ্জ হাসির ঝিলিক। ‘খুকু গ্যাছে জল আনতে পদ্মদিঘির ঘাটে।’ মুগ্ধ বিস্মিত, বাহ্! বাহ্! বাহ্! কয়েকটি অব্যয় প্রকাশ করে শিবেন্দু থলে হাতে এগোলেন। হৃদপিণ্ডে অজানা মোচড় এবং…
-

দূর দিগন্তে অন্ধকার
বৈকুণ্ঠ। এখানে দুঃখ অপমান নিরাশা প্ররোচনা লালসা রিরংসার বড় অভাব। এখানে যা আছে, তা শুধু ভালোবাসাবাসি, শুধু সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য। বৈকুণ্ঠে কারো প্রতি কারো পক্ষপাতিত্ব নেই, নেই আবার ঔদাসীন্যও। সবাই সবাইকে ভালোবাসে, আবার সবাই সবার প্রতি নির্মোহ। এখানে কারো প্রতি কারো হিংসা নেই, নেই কোনো বিতৃষ্ণাও। ক্রোধ বৈকুণ্ঠ থেকে চিরতরে নির্বাসিত। এখানকার অধিবাসীদের লোভ-ভোগেচ্ছা একেবারেই…
-

নায়িকার অটোগ্রাফ
বিশ্বজিৎ চৌধুরী সকাল ঠিক নয়টায় ডাইনিং হলে প্রবেশ করলেন তিনি। বিশাল দরজা ঠেলে ঢুকেই দু-পা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সুপরিসর কক্ষটির ভেতর চোখ বুলিয়ে নিলেন একবার। প্রাতরাশ সাজানো গরম পাত্রগুলো কোন দিকে রাখা আছে এবং নিজের জন্য প্লেটে খাবার নিয়ে কোথায় গিয়ে বসবেন তা ঠিক করে নিলেন বোধহয় ওখানে দাঁড়িয়েই। তারপর ধীর অথচ দৃপ্ত পায়ে এগোলেন।…
-

কালো ভোর
ভোরে এই বাসায় কেউ ঘুম থেকে ওঠে না আমি ছাড়া। আমি উঠি, উঠে বারান্দায় বসে থাকি একা একা, তারপর অঙ্ক কষি আর ভোর দেখি। আজকে ভোরে উঠেছে আম্মা, ভোর মানে অন্ধকার থাকতে। আব্বার কড়া নাড়ার শব্দে জেগে উঠেছি আমি আর আম্মা। আব্বা হাত-মুখ ধুয়ে এলে কিছু খাবেন কি না জিজ্ঞাসা করল আম্মা। আব্বা মাথা হেলিয়ে…
-

বিসর্জন
ডাকুকে আমি ক্ষ্যাপা বলেই জানতাম। বছর-পঁয়ত্রিশের ডাকু পাশের পাড়ার ছেলে হলেও সে আমাদের পাড়াতেই দিনমান কাটায়। আমাদের পাড়াতে যেসব দোকান আছে, ডাকু সেইসব দোকানদারদের ফাইফরমায়েশ খাটে। ফাইফরমায়েশ বলতে কাউকে চা এনে খাওয়ায়। কাউকে বিড়ি-সিগারেট এনে দেয়। আমার কাউকে বিকেলবেলা চপমুড়ি এনে খাওয়ায়। সঙ্গে নিজেও খায়। আমাদের পাড়ায় হরেকরকমের দোকান আছে। মুদিখানা, ফার্মেসি, জুতোর দোকান, মিষ্টির…
