June 2021
-

বন্যা
‘শিল্পগুরু’ সফিউদ্দীন আহমেদ এদেশের আধুনিক শিল্পকলা চর্চায়, বিশেষত ছাপচিত্রের আধুনিকায়নে, পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন। তাঁকে বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রের ‘জনক’ বলা হয়। তিনি ছিলেন সর্বদাই পরিবর্তন-প্রয়াসী। গত শতকের চল্লিশের দশকে পশ্চিমবঙ্গে সাঁওতালদের জীবন ও প্রকৃতি নিয়ে যে-আঙ্গিকের কাজ করেছেন, পঞ্চাশের দশকে এসে তা পরিবর্তন করেছেন। নতুন চিত্রভাষা উপহার দিয়েছেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এবং বানভাসি মানুষ বিষয়ক কাজের…
-

সিরাজীর সৃষ্টিসত্য
ব্যক্তিজীবনের সীমিত আয়ু পেরিয়ে ২৪ মে ২০২১ তারিখে আমার বন্ধু কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী চিরজীবনে প্রবেশ করেছে। এখন থেকে তার সুপুষ্ট রচনাসম্ভারই তার প্রধান পরিচয়। দেখতে দেখতে পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাট পেরিয়ে সত্তর পেরিয়ে তিয়াত্তরে প্রবেশ করেছিল সিরাজী। কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ পালকটি তখন তার মুকুটে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক রূপে প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত। তারপরেই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে…
-

সিরাজীর প্রথম কাব্য : ‘শব্দে শব্দে বিয়া’
প্রথম কাব্যগ্রন্থ দাও বৃক্ষ দাও দিন থেকেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিসত্তা নিজের পথ সন্ধান করে নিতে চাইছিল। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে, মোট ৪৫টি কবিতার সমাহার। তারপর শুধু লিখেই গেছেন অন্তরতাগিদে, একের পর এক কবিতাগ্রন্থ বের হয়েছে। বিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছেন কি? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রবেশ করতে হয় তাঁর রচনার গভীরে, চিহ্নিত করতে হয়…
-

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : কবিতা ও গদ্যের মায়াভূমি
ঈহার অন্দরে জীবনের সত্তর বসন্ত অতিক্রম করে একাত্তরে এসে বাংলা কবিতামালঞ্চে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর উপহার-কুসুম ঈহা (২০১৯)। প্রারম্ভ কবিতা ‘কুয়ো’, সমাপ্তি এবং নামকবিতা ‘ঈহা’। ১৯৭৫-এ দাও বৃক্ষ দাও দিন দিয়ে যে-কাব্যিক অভিযাত্রাবিন্দুর অবতরণিকা, ২০১৯-এ ঈহায় এসে তা নবমাত্রাগামী। না হলে পুস্তকের সূচনাতে কী করে কবি উচ্চারণক্ষম – আমি কবিতা পাঠ করি না অশ্রু পড়ি অতল কুয়োয়।…
-

আনিসুজ্জামান-জীবনকথা
এক ‘আনিসুজ্জামান ছিলেন একাধারে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক, অভিনিবিষ্ট গবেষক এবং অসাধারণ রকমের সংস্কৃতিসচেতন। এই তিন গুণের যে-কোনো একটিই একজন মানুষের জীবনকে চরিতার্থতা দেবার জন্য যথেষ্ট; তাদের একত্রযোগ তো একান্ত বিরল ঘটনা। আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রে এই বিরল ঘটনাটাই ঘটেছে। একজন ভালো শিক্ষক যে উচ্চমানের গবেষক হবেন, এমন কোনো নিয়ম নেই; আবার সার্থক গবেষকদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে তাঁরা…
-

ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড এবং আশাপূর্ণা দেবী : ছোটগল্পের আলোয় দুই নারীর মানসভুবন
পৃথিবীতে সকল সময়ে যখন সমাজে কোনো বড়সড় পরিবর্তন ঘটে তখন সেই পরিবর্তনের কম্পন সাহিত্য ও শিল্পের আঙিনাতেও ধরা দেয়। প্রাচীন ইতিহাস বলে, রাজতন্ত্র যেমন অভিজাত শ্রেণির আমোদ-প্রমোদের উপকরণ হিসেবে হাজির করেছে কাব্য ও শিল্পকলা, তেমনি মেহনতি মানুষও আপন অবসরে সৃষ্টি করেছে মনের খাদ্য। সেসবের উৎকর্ষ কিছু কম নয়। সমস্ত যুগসন্ধিকালে মানুষ নবলব্ধ বিপ্লবচেতনা দিয়ে গড়ে…
-

বন্দী-বিবেক সমাজ ও কবিমানস
আবদুল গনি হাজারী যে -কথাটা লোকেরা নিজেদের মধ্যে অনেক কাল থেকে বলাবলি করে আসছে, অথচ সাহস করে বলতে পারছে না, কিংবা বলবার মত সময় আসে নি বলে ভেবেছে, আমার মনে হয় সেই কথাটা বলার প্রয়াসই প্রবন্ধটিতে (সংস্কৃতি-চিন্তা, সমকাল : কার্তিক, ১৩৭১) ছিল। সাহসের কথা বলার মধ্যে একটা পরোক্ষ আত্মশ্লাঘা রয়েছে বলে অনেকে সন্দেহ করতে পারেন।…
-

রোজভ্যালি
মিজানুর খান বাইরে থেকে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ক্যাঁচক্যাঁচ করে একটা চিকন শব্দ হলো শুধু। রুশনারার কাছে এই আওয়াজটা খুবই পরিচিত। ওর মুখস্থ হয়ে গেছে – কত জোরে ঠেলা দিলে ঠিক কতটুকু আওয়াজ হয়, কেমন হয় সেই আওয়াজ। তাই সে এখন আর আগের মতো বিরক্ত হয় না, হলেও নিজেকে বুঝ দেয় – আর…
-

না-বলা কথা
লাউঞ্জের বাইরে বেরিয়ে বাবাইকে হাত নাড়তে দেখে এতক্ষণকার যাবতীয় উৎকণ্ঠা দূর হলো। প্রথমত এই আমার পয়লা আকাশপথে ভ্রমণ, তার ওপর সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে সম্পূর্ণ অজানা দেশে! টানা বারো ঘণ্টা একনাগাড়ে বসে থেকে হাতে-পায়ে যেন খিল ধরে যাওয়ার জোগাড়। আমার পাশের সিটে এক সাদা চামড়ার মাঝবয়েসি বিশালবপু সাহেব বসে ছিলেন। শুরু থেকেই আমার জড়সড়…
-

করোনা কথা
শিশির ভেবেছিল ওর হবে না। শেষমেশ ওরও হলো। সামান্য খুসখুসে কাশি আর না-বলার মতো জ্বর। একশর নিচে ওটা কি কোনো জ্বর ? তবু সে বরাবরই সচেতন মানুষ। তিন মাস আগে ডি ভিটামিন খেয়ে রেখেছে পেটপুরে। স্ক্যাবো, লং-চা, লেবুর সরবত, হোমিও ওষুধ – কোনটা নয়? মাস্ক-শিল্ডের আভরণে চেহারা চেনা দায়, মধ্যযুগের বর্ম পরা সৈনিক যেন সে।…
-

কোজাগরি জ্যোৎস্না
দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পথ। পাকা সড়ক সমতল ছাড়িয়ে লাটিমের লেত্তির মতো পাক খেতে খেতে একেবারে উঠে গেছে পাহাড়ের মাথায়। সমন্বয় নিজেই ড্রাইভ করছে। যদিও সে খুব একটা পটু নয়, তবে মাঝেমধ্যে ড্রাইভার ছুটি নিলে এদিক-সেদিক যাওয়ার অভ্যাস আছে। শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় চালানো শক্ত, তার চাইতে হাইওয়েতে চালানো তুলনামূলকভাবে সোজা। আর ওয়ানওয়ে…
-

ইঁদুরের জন্য প্রার্থনা
মাঝরাতে ধড়াম করে কোনোকিছু পতনের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। রান্নাঘরে ইঁদুরের উৎপাত বেড়েছে, টের পাই। সানসাইডে দুটো ইঁদুরের হুটোপুটিতে প্লাস্টিকের বোতল বা বয়াম নিচে পড়ে গেছে। আগেও এমন হয়েছে। সাধারণত রাতের বেলায় ওরা আসে। দিনেও আসে, কদাচিৎ। অনিচ্ছুকভাবে বিছানা ছেড়ে রান্ন্নাঘরে যাই। নিচে পড়ে থাকা বয়াম ওপরে রাখার ছলে শব্দ করি, এই যাহ্। বেরিয়ে আয়।…
