2026

  • বাবার যত বাণী

    বাবার যত বাণী

    বাণী একটা ভারি পদ। আবার মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে এর জন্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুখের কথা বাণী। বাণী বিদ্যাদেবী সরস্বতী। যাকে আমরা বীণাপাণিও বলে থাকি। বাণী বলতে সাধারণত বুঝি কোনো গুণীজন বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির আশীর্বাদ বা জ্ঞানমূলক বক্তব্য। আর একটি প্রধান অর্থ, একজনের সারা জীবনের সারকথা, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যেমন সক্রেটিসের উক্তি : নিজেকে…

  • বৃক্ষ

    বৃক্ষ

    তরু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শিশুবেলাটা আনন্দেই কেটেছে। যেই একটু বড় হলো, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, যন্ত্রণাটা তখন থেকে শুরু। স্কুল বন্ধ। নির্জন দুপুরে জানালার ধারে বসে তরু একটি বই পড়ছে। কিছুক্ষণ পরপর ফ্রকের ঝুল দিয়ে চোখ মুছছে। তরুর খুব কষ্ট হচ্ছে। বইটি রেখে দিলে তার কষ্ট বন্ধ হয়। কিন্তু বইটি সে রাখতে পারছে না। বরং কী…

  • মোমিনউদ্দিনের দিগদারি

    মোমিনউদ্দিনের দিগদারি

    মোমিন সাব নাকি একলা মানুষ! বিজন, এক ভাবের মানুষ? মানুষটার ঘরভর্তি স্ত্রী, পুত্র, নাতিনাতকুর, আত্মীয়স্বজন, ভাই-বেরাদর। গুষ্টি-ইষ্টি-পড়শি। সেই মুরুব্বি একলা কেমনে? সত্য, ঘরভরা স্বজন, হইহল্লা। … কপালি মানুষ, সম্মানী মানুষ, জানেওয়ালা মানুষটা। তাঁর ভাবের দুনিয়া, জাহেরি বাতেনি সকলের মগজে আঁটে না। নুরানি সুরুতের মুরুব্বির আশেকে দিওয়ানা, মহল্লার সহজ-সরল এমনকি কূটকচালি জনমানুষ। জন্মভিটার আদি ঢাকাইয়া কুট্টিজনও…

  • কৃতজ্ঞতার বনবাস

    কৃতজ্ঞতার বনবাস

    সকালহাঁটাটা ডিসি হিল পার্কেই সারেন অখিলেশবাবু। বাহাত্তর পেরোনো বয়স। বাহাত্তরের থুত্তুরে বুড়া – এই কথাটি অখিলেশবাবুর জন্য খাটে না। জমাটবাঁধা শরীর না হলেও পেশিগুলো ঢিলেঢালা হয়ে যায়নি এখনো। লম্বাতেও কম না তিনি। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। তার শরীরে দোষ যে নেই, তা কিন্তু নয়। ওজনটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি। সাতাত্তরের স্থলে আশি কেজি। ডায়াবেটিস একটু…

  • অশরীরী

    অশরীরী

    এখানে এসেই থেমে পড়ে সামিউল। প্রায় তিরিশ মিটার দূরের বাড়িটি ইথারে অদ্ভুত নিশ্চুপ কণ্ঠে ডেকে যায়। ‘আয় সামিউল, এখানে আয়। আয় রে।’ সামিউল সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে থাকে ক-মুহূর্ত। তারপর পুনরায় সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। অনেক কাজ। যেতে হবে বেশ দূর। একদিন সত্যি সত্যি ওই বাড়িতে যাবে। কী আছে সেখানে? কে ডাকে তাকে? অচেনা হিম হিম…

  • ফ্লাইওভার

    ফ্লাইওভার

    এক ফ্লাইওভার এই তল্লাটে নতুন এসেছে। ফ্লাইওভার আসার আগে এখানে শুধু রাস্তা ছিল – মাটির ওপর দিয়ে চলা একটা সরল জিনিস, যেখানে হাঁটতে গেলে পা লাগত মাটিতে, চোখ পড়ত সামনে, আর মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হতো প্রায় সমান উচ্চতায়; কিন্তু ফ্লাইওভার মানে হলো মাথার ওপর দিয়ে চলা রাস্তা, যেখানে আয়েশ করে হাঁটা যায় না, এমন…

  • মিতুর জন্মদিন ও একটি ছবি

    মিতুর জন্মদিন ও একটি ছবি

    রাতে খাবার সেরে স্ত্রীর হাতে যত্ন করে বানানো পানটা মুখে পুড়ে নতুন কেনা সোফায় হেলান দিয়ে হোসেন আলী বলে, ‘কী, কেমন লাগতাছে, ভালা না?’ স্বামীকে দেওয়ার পর এবার নিজের পানটা মুখে চালান করে দিলো শানু। পানটা বেশ ঢাউস সাইজের হওয়ায় মুখের ভেতরের প্রায় সবটা জায়গা দখল হয়ে গিয়েছিল। এমনিতে পান সে বেশ সময় নিয়ে আরাম…

  • দেল বকসের নবাবি খোয়াব

    দেল বকসের নবাবি খোয়াব

    মাঘ মাস সবে শুরু, শীতের কামড় ততটা নেই এবার। মানুষের চাঞ্চল্য কমতে থাকে। বাড়ে পরিযায়ী পাখিদের মেলা; বসে নানা জায়গায়, পৌষের চিরকেলে রূপ বদলে গিয়েছিল এবার। মাঘের শীত বাঘের গায়ে – এমন কথা বলার জো ছিল না এবার। হাড়কাঁপানো শীতে কাবু ছিল তামাম মানুষ। মাবুদ আর জার দিও না – এমন কথা বলছে অশীতিপর বাসমতি…

  • ইশতাহার

    ইশতাহার

    ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! অকস্মাৎ একদলা ঘৃণা আমার গায়ে এসে না পড়লে আমি বোধহয় কখনোই এ-গল্প লিখতে বসতাম না। যদিও চার বছর ধরে সময়ে-সময়ে রাগ, ঘৃণা, অপমানের নানা ছিটেফোঁটা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পেয়ে এসেছি; কিন্তু গায়ে মাখিনি। সম্ভবত এর কারণ ছিল, মানুষ যখন নিজের মনে জানে সে অপরাধী নয়, তখন তার মনে নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজেকে…

  • দ্বৈত

    এই যে এখানে এলে বাদামের খোসা পেলে        অবশিষ্ট হাতে যাকে ভাবলে বাওবাব সে একটি নৈশ ক্লাব        ফুরায় প্রভাতে সকালে এমনই তোর তৈরি হয়েছিল ঘোর        কীভাবে বেরোবি নতুন বর্ষ আসে ডোবা তাতে পোকা ভাসে        বিধ্বস্ত ছবি পদ্ম যে অবিচল তোর কী হয়েছে বল্       কালো দেখছিস পিরিচে সাজানো বেল নাগলিঙ্গমে উদ্বেল      …

  • আমার মৃত্যু হবে, তবু বেঁচে থাকবো

    আমার মৃত্যু হলে ভাববে সব চুকেবুকে গেল আমি আর থাকবো না কোথাও, কিন্তু আমি তো যাবো না এই লোকালয় ছেড়ে – শূন্য কফিন নিয়ে আমাকে গোর দিতে যাবে তোমরা অঝোরধারায় বৃষ্টি ঝরবে তোমাদের চোখের অশ্রু আর বৃষ্টির জলের মিলিত ধারায় সহস্র চাতক তৃষ্ণা মেটাবে, পিপাসার্ত আমি কোথাও জল খুঁজে পাবো না, কোথায় সে অবিরল ঝরনাধারা…

  • কফি কাপ

    অবহেলায় পড়ে থাকা কফি-কাপ আমাকে নাড়িয়ে দিলো তা শুধু স্মৃতি নয়, বরং এমন গল্প যা ফুরায় না কোনোদিন – আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম এত নিঃসঙ্গ পড়ে আছো কেনো কাপ নড়েচড়ে বসলো – আর শুরু করলো অবরুদ্ধ সময়ের গল্প : সেই নারী যে ভালোবাসতো তোমাকে – সে তার ঠোঁটের তুলিতে রংধনু এঁকে ছিল কপালে ধূসর আকাশ…

  • আলাপ

    – সীমাবদ্ধ গল্পের ভেতরে থেকে জীবনের মহিমা বুঝবে না। এর জন্যে প্রয়োজন উড্ডয়ন, প্রতিকারহীন সর্বজাল ছিন্ন করা অহমিকারিক্ত এক নম্র অভিযান, অভিমান-পরিত্যাগী বেদুইনের পরম              যাত্রা-পথ – বৃত্তভাঙা চাঁদের আলোর নিচে চোখ বন্ধ রাখা এক ধীমান প্রতিজ্ঞা, শূন্য হাতে শূন্য ক্রোধ শূন্য মুঠি শূন্য শোক-জাল আর বিস্তারিত অসীমের অবাধ ঠিকানা – আলো জ্বালো, আলো ফেলো…

  • বসন্তের উদার সৌন্দর্য

    ইটবাঁধানো কষ্ট নিয়ে          বসন্ত এলো,        কাঁচামাটি দিয়ে তৈরি ঘরে! বসন্তের অন্তরা খুলে ঘনিষ্ঠ হবো   অন্তরাত্মা শান্তি পাবে বলে     আমিও সবুজের মূলধন নিয়ে  নিজের হৃদয়ে সম্পাদকীয় লিখতে চেয়েছিলাম! কিন্তু এবারের বসন্তে –    যে কুঁড়ি ফুটতে চাইছিল,       তা আর ফুটল না –          পুষ্পবাগানও হতবাক হলো! বসন্তের দিনেও আত্মকলহ ও আত্মকর্তৃত্বে…

  • ভালোবাসা নিঃশর্ত হোক

    ভালোবাসা নিঃশর্ত হোক যেমন নিঃশর্ত হয় ভোর  জলপতনের ধ্বনি। সবাই নিসর্গে যাবে  যেমন নিঃশর্ত যায় নদী  বীজপাতা খুলে দিয়ে যেমন উদ্ভিদ  হৃদয়ে ধরিত্রী মাখে। যেটুকু ধরেছো তুমি  লুকোছাপা-খেলা দুই হাতে  তারও বেশি  ঝরে পড়ে নীল নীলাকাশ হতে  পাখিদের মৌনতা ভাঙে রাতভোর, প্রাতে। ভালোবাসা নিঃশর্ত হোক যেমন নিঃশব্দ বাড়ায় হাত ঘুমছায়া বট গোধূলির আঙুল ছুঁয়ে চুপে  ঘন হয়ে নামে রাত আমাদের ঘরে যেমন নিঃশর্ত ছড়ানো এই ট্রপোস্ফিয়ার  হিরণ ধূলির পথ, পলি সমতল  আর আলো ফুটলেই আয়নায়  অবলীলায়িত কারো ছায়াপাত –  আমাদের বোধের ভেতরে  বীজফোটা দিন, ছায়াময় ব্যাকুলতা  নদী ও প্রভাত …

  • ঈশ্বরীয় বিশ্বাস ও অবিশ্বাস

    ঈশ্বর আছেন অথবা ঈশ্বর নেই – এ দুই এর মধ্যে ঝুলে আছি ঘড়ির পেন্ডুলাম হয়ে অথচ নিতান্ত মূর্খ এক হাটুরে বললো, দৃষ্টিগ্রাহ্য সবকিছুই বিশ্বাস করতে নেই, তেমনি অদৃশ্য যা কিছু, সবটুকু মিথ্যাও নয় আছেন অথবা নেই এর মধ্যেও ঈশ্বর খুঁজেছি, বিশ্বাসের মজবুত রজ্জুতে বন্দি ঈশ্বরের কালো চশমাটা খুলে দেখি আমারই প্রতিবিম্ব

  • জীবন বুনে

    কোথাও বোমা পড়লে কেঁপে উঠি, মনে হয়, তোমার কাছে যাওয়ার পথ কি ভেঙে পড়লো আগুনের ধাক্কায়! পথ ভরে আছে মিছিল আর মিছিলে, ক্রোধের বাইরে নয় এতটুকু জায়গাও যেখান দিয়ে আমরা হাত ধরে যাব পরস্পর। গোলাপ চাষ হচ্ছে না, চাষ হচ্ছে হত্যার, চাপাতির আঘাতে টুকরো টুকরো বিকাল তার ভেতর রান্না হয় শিশুদের আর্তনাদ। ভেঙে পড়া রাস্তা…

  • কপোতাক্ষপাড়ে গিয়ে

    কপোতাক্ষপাড়ে গিয়ে শীতের রোদ্দুর গায়ে মাখি। তারপর ফিরে আসি কাঠবাদাম গাছের নিচে। মিষ্টি বউদি এসে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে আমাকে দেখেন। যেন আমি কোনোদিন একা একা কপোতাক্ষপাড়ে আসতে পারি না। যেন আমি রাজনারায়ণ দত্ত আর জাহ্ণবী দেবীর নামটা শুনিনি। যেন আমি মাইকেল মধুসূদন দত্তের টানে কখনো আসিনি সাগরদাঁড়িতে। যেন আমি কলকাতা আর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে গিয়ে…

  • কাচের বাইরে কুয়াশার মেঘ

    একটুখানি পানি জমতে শুরু করেছে কাচের বাইরে কুয়াশার মেঘ। ডিপ কালারের একটি স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছে। রাত বারোটার কিছু আছে বাকি; এই থাকা অর্থহীন নয়। চলো, উপলব্ধি করি কুয়াশা মোড়ানো এক বাংলো বাড়ি; যার কড়িবর্গা নেপালের সেগুনের ফাইবার পূর্ণ এক দোআঁশ মাটির অনুবর্তী হতে চায়। আমাদের দেহলি দরদ উথলায় যেখানে, সেখানে এক রাত্রি কুজ্ঝটিকা…

  • তোমার বাগান ছেড়ে

    ভুল পথে হেঁটে হেঁটে তোমার বাগান ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছি। কুয়াশার অন্ধকারে-ঢাকা দীর্ঘ পথ। কেউ জানে না, বাগানবাড়ির ঠিকানা; তবে কী সব ফুল ঝরে গেছে? এখন এক বিষবৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে আছি একা সব মানুষ খুব ব্যস্ত অস্থির – আমি কি ডালভাঙা জীর্ণ-শীর্ণ মৃত গাছ – আমাকে দেখে না কেউ! এই বৃক্ষের নিশ্বাসও সর্পিলছোবল হয়ে…

  • বারুদ

    একটু হাওয়া দিক তারপর জানলাটা খুলো, বিরহের পর কাঁদে যতনে মানুষ – ভেজে তুলো পুরনো ডায়েরি পড়ে আছে, ব্যথা সকল পাতায়, একটি লাইন শুধু কালিহীন বুকের ছাতায়। ধরে রাখি শ্বাসমূলে, ঋতু আসে-যায় অলৌকিক বাঁশিতে লেগেছে ঘ্রাণ, সুরগুলো মায়ার অধিক আহা রে শ্রাবণ! সাদা-কালো মেঘগুলো দূরকামী, আমার চোখের ’পরে আসে তারা বেহায়া বেনামি। ভিজে যাচ্ছে ভুলগুলো,…

  • বকুল ফুটেছে কোথাও

    বকুল ফুটেছে কোথাও, বুঝি শোনা যায় পদধ্বনি বসন্তের এইখানে ধূলি-ধূসরিত পথ, বাতাস এখানে ভারী মৃদু ক্রন্দনে ঝরাপাতাদের। অবশিষ্ট কিছু শীত হচ্ছে জড়ো সন্ধ্যায় গোল হয়ে আগুন পোহাবে বলে ছোট একটা মাছ পেয়ে মাছরাঙা উড়ে গেছে কোথাও, খড়কা বিলের ধারে পানকৌড়ি বসে আছে সেই সকাল থেকে! বকুল ফুটেছে কোথাও গাছে গাছে মুকুল এসেছে আমের। শিশুরা নতুন…

  • কথা

    এত কথা কেন বলো তুমি? করো মৌনতার চাষাবাদ ভিতরে-বাহিরে হও কসমিক এনার্জি হও প্রকৃতির মতো গাছ কোনো কথা বলে না গাছ সুন্দর পাখি কোনো কথা বলে না পাখি সুন্দর – নদী কোনো কথা বলে না নদী সুন্দর তুমি কেন বৃথাই         করো কলরব করো শব্দ সন্ত্রাস – হও সূর্যের আলো হও সোনালি বাতাস পাথরের নদী,…

  • শেষ কথা

    যাকে আনন্দের মাধ্যমে এতদূর নিয়ে এলাম তাকে ছেড়ে দিতে হবে দুঃখের মাধ্যমে কষ্টের নিয়মে। যে গাছ নিজ অঙ্গে ফোটালো ফুল উৎসাহের আলোক বরণে তাকেই দেখতে হলো দিনবেলা শেষে ফুলের অমোঘ মৃত্যু – সকরুণ রঙে। পথ শেষ হয়। রং শেষ হয়। সুখের নদীতে নামে ভাটা। একই জল দেহের উল্টো দিকে ফেরা। ফেরায় বোনা সন্ধ্যা ফেরায় বোনা…