কবিতা
-
জল তানপুরা
জানালায় কাঁপে উজ্জ্বল ভোরের কিশোরী-হাওয়া তাকিয়ে আছে সদ্য ফোটা ঘাসছোঁয়া উষ্ণতা আমার ছায়া নিজেই এখন ভবিষ্যতের রথ … আলোর বেগে ছোটে, মাটির বুকে রেখে যায় চিহ্ন দিন গড়ায় – নক্ষত্র কাছে আসে তপ্ত স্মৃতি নিয়ে তাকে ছুঁই, টেনে আনি হৃদয়ের নীল অনুরণনে যা কিছু লুপ্ত, তা নয় আমার ভাষা, বলি সেই গল্প সোনালি ধানের আঁচলে…
-
পানাফুলের দেশে
বেইজ্জতি করিও না আর। কলঙ্কী করিও না আর। আমি তো তোমার নামে বান্ধিতেছি গান। আমি তো তোমার তরে ছাড়িয়াছি ঘর। ছাড়িয়াছি দেশখেশ, হইয়াছি পর। মিনতি রাখিও তুমি। অধমের। বদনামি করিও না আর। বেইমান বলিও না আর। আমি তো আসিবো ফিরে। মাথায় ময়ূরপুচ্ছ, হাতেতে বাঁশুরি। রজনী ব্যাকুল হবে। হয়তো তখন বারিষ নামিবে। ফুটিবে কদম। তুমিও ধরিবে…
-
আবহমান অস্তিত্ব
রৌদ্রের ঝলমলে উচ্ছ্বাস, তেজি উত্তাপে দাহ হয় মধ্যাহ্নের নরম শরীর। জলতেষ্টায় মলিন কামিনীর ঘ্রাণ। শীতল জলে ডুবে থাকা চাতকের তৃষ্ণার্ত চঞ্চু জুড়ে আমাদের আবহমান দুঃখগাথা। ধানক্ষেতের সোনালি সবুজ আভায় উঁকি দেয় শেকড়সন্ধানী মানুষের অযুত নিযুত ইচ্ছে। তারা ভেসে বেড়ায় নদীবক্ষে, স্রোতের টানে, মাঝিমল্লার ভাটিয়ালি সুরে। আমাদের দগদগে ক্ষতগুলো এখনো আরক্ত শুঁড় নাড়িয়ে ভয় দেখায়। জাজ্বল্যমান…
-
বাড়ি
‘ম্যাঁয় আন্দলিব্-এ গুলশান-এ না আফরিদা হুঁ’ – মির্জা গালিব তুলট মেঘেরা ওড়ে কখনো উত্তরে কখনো পশ্চিমে জলহাওয়া ভাঙে পাহাড়ি পাথর নেমে আসে ঝরনাতলায় – নদীজলে সে হাঁটে আঁধার ঢাকা গাঁয়ে ।
-
একাকী খুঁজে ফিরছি
কোনো এক বসন্তের গন্তব্যহীন সন্ধ্যায় ভালোবেসেছিলে – প্রিয় ‘বনলতা সেন’ অনেক পৃথিবীর অতীত কাব্যের শরীরে তোমার ধূসর পাণ্ডুলিপির ’পরে আলোর অজস্র পাতা পড়ে – অন্ধকারে; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা মুছে ফেলে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিভৃতির মর্মমূলে তোমাকেই একাকী খুঁজে ফিরেছি ধানসিড়ি নদীটির তীরে করুণ-বিষণ্ন শালিকের ভিড়ে; ভাবিয়াছি তোমারে বহুদিন পুরনো কলকাতার পথে – নিঃস্বতার দীর্ঘশ্বাসে…
-
সপিনা
তোমার পাশে বসে আছে সে অ্যালবাট্রস এক বসে আছে আরেক অ্যালবাট্রসের পাশে অক্স, আজ বিকেলের আইভি দুলছে অক্সফোর্ড-এ নরম সপিনা পেয়ে হাসছো বাঘের মতো? বুল, এল ডোরাডোর ডোরাকাটা চামড়ায় বুলাও জিভ সবার ঠোঁটেই খানাপিনা আর ভোগবিলাস গরু, হাঁচি দিয়ো না, গরুড়ের মতো উড়ে যাবে মাল, পাখি, সব।
-
উত্তরাধিকার
এ ধুলোপথে নিবেদিত ইতিহাসের চাবি; গন্তব্যের শ্রাবণ অবুঝ বণিকের ক্লাউন – থামাও তোমার জুতোর শব্দ। দ্যাখো – পাখি উড়ছে পালকের পাপ; সৌন্দর্যের দায় ঠোঁটে। আমার কৃষক পিতার নিবিড় চর্চায় মাঠ – ফসলের গেরিলা তাঁর লাঙল রোদকথায় পূর্ণ; ক্ষুধাবিরোধী মিছিলের দৃঢ় সমতা। তুমি জানো না অন্ধ, আমি সেই বৃক্ষের বীজ যার পূর্বপুরুষ স্বপ্নের বদলে ফেলে এসেছে…
-
প্রেতের নগরে
পূর্ণিমার এক রাতে সুরমার বুকে নেমে এসেছিল চাঁদ – একাকী, মায়াবী, নিঃশব্দ দীপ্তি। হঠাৎ ছায়ামানবেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে ভূত? না, প্রেতাত্মা! আদতে ওরা চাঁদটাকেই খেতে এসেছিল সুরমার জল ঘোলা করে। শেষতক ঘোলাটে জলে চাঁদের মৃত্যু ঘটে নিভে যায় এক অপার সৌন্দর্য। সেই থেকে প্রেতের নগরে জ্যোৎস্না আসে-না আর। নাগর হেঁটে চলে অন্ধকারে – আলো খুঁজে, আলো…
-
কবিতা
কবিতা স্বপ্নের মতোই থেকে থেকে উঁকি দেয় চেতনার শৈল্পিক নগরে। ভাবুক মনের ঘরে ঢেউ খেলে শব্দ ছন্দের ব্যাকুল তৃষ্ণা, উজ্জীবিত অলকানন্দা ফুল। বাবুই পাখির ঠোঁট যেরকম ক্রমে ক্রমে বুনে যায় বাসা সেই ধাঁচে কবি তার নিপুণ হাতে এঁকে যায় কবিতার রূপ, বোধ ও অব্যক্ত বেদনার লিপি। কবিতা প্রেমিকার মতোই মাঝে মাঝে দেখা দেয়, মাঝে মাঝে…
-
ফল বেশি দরকার
ওরা আনন্দিত কণ্ঠে বললো – কবি আপনি আমাদের এখানে এলে আমরা আপনার জন্যে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো! আমি বিষণ্ন স্বরে বললাম – গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল নয় গো! ছোট্ট একটি ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকো! আমি ভীষণ অসুস্থ! এখন আমার ফুলের চেয়ে ফল বেশি দরকার!
-
একটাও কবিতা লেখা হয়নি
আপন নিউক্লিয়াস মধ্যমণি, নিজ বৃত্তপথ ঘোরাঘুরি বাতাস ভারি আত্মরতির রোলে চোখ অন্ধগলি, দেখে না পড়শি বটপাতাদের রংবদল স্থির নদ, ঢেউ তোলে না পাশে দাঁড়ানো ‘মরিয়মে’র নোনা জল মাথা রাখে না কেউ কারুর কোলে আমার বন্ধ্যা কবিতার খাতায় শুধু শূন্য-শূন্যের লুকোচুরি
-
তাচ্ছিল্য
তোর নাম কী রে, ক্ষীর বরফের গুঁড়ো গলে যাস, গলে যাস ভাঙাধান কুড়ো উড়ে যাস, উড়ে যাস তোর নাম কী রে, ছায়া অপার্থিব পৃথিবীর ভার্চুয়াল কায়া ভেসে গেছে হরীতকী ডুমুরের বন এ কী প্রবল শ্রাবণ এ কী প্রবল প্লাবন তোর নাম কী রে, মেঘ উড়ে উড়ে যাস ওটা তোর বাড়ি নয়, ভুলের আকাশ
