কবিতা
-
কবি-সম্পাদকের প্রয়াণে শোকপঙক্তি
(সম্পাদক আবুল হাসনাত ও কবি মাহমুদ আল জামান। একই বৃন্তে যুগল কুসুম) ধ্যানেজ্ঞানে কায়মনে আজীবন ছিলে তুমি নিঃসঙ্গ উদ্ভিদ ব্রতী ছিলে সম্পাদনে, একেলা নির্জন কবি তপস্যামগন, নিভৃতিপ্রিয়তা ছিল চিরসঙ্গী যেন শান্ত নিঃশব্দ ঘুঙুর হয়তো কোনো বহতা নদীর নাম, মর্মরিত দোলায়িত হাওয়ার বেহালাছড়ে বেজে উঠছে তোমার না-থাকা, আকস্মিক মৃত্যুর ছোবল এত ভয়াবহ কেন হয় কেন এই…
-
ভুবনডাঙায়
(প্রিয় অগ্রজ আবুল হাসনাত স্মরণে) এখনই ফিরে যাব? এত যে বৃষ্টির অবিরল ধারা আকাশ কী দুঃখ পেল শুধুই কি আলো জ্বেলে গেছি নিভন্ত কলমে? নরম মাটির টানে কুমোরের হাত চলে যেত কাব্যের শরীরে গনগনে অক্ষরের ছাঁচে গড়েছি প্রতিমা উত্তাল ঊনসত্তর, মিছিলের ঘর্মাক্ত মুখ যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর, কোথায় হারিয়ে গেছে বিসর্জন প্রথম অর্জন কোনো এক জীবনের!…
-
সেই বৃক্ষমহিম
(আবুল হাসনাত স্মরণে) জোছনার তবক জড়ানো একজন সৌম্য চলে গেলেন পশ্চিমে সেই বৃক্ষমহিম প্রকাণ্ড গুঁড়ি পাতা ভর্তি ডালপালা সরল পাখি পাখির সুস্থ বাসা বৃষ্টি না-হারানোর কথা ছিল গহিন শিকড়ে প্রদোষকালের ছেঁড়া ছেঁড়া আলো পড়ে আছে ধানক্ষেতের ঢালে বাংলা ফুলের বিজনলাগা মুখ যেখানে অজস্র অ মানে যোগ আ মানে বিয়োগ ক মানে গুণ খ মানে ভাগ…
-
যাই
(কবি-সম্পাদক আবুল হাসনাতকে নিবেদিত) যাই, চলো যাই, যাবার বিকল্প নাই, চলো, রূপে ও অরূপে যাই; চলো, যেতে যেতে নিত্য বিবর্তনে যাই; স্থিরচিত্র থেকে স্বরূপ-অরূপ চিত্তে নিত্য সমর্পণে যাই। বদলপ্রবণ পায়ে এতদূর আমরা এসেছি। বিবর্তিত শুদ্ধচিত্তে বারবার আমাকে পেয়েছি। ফলনপ্রবণ দেহ, নিত্যবৃত্তে নবায়িত মন যুগলে ভ্রমণরত, সর্ব অঙ্গে ডানাসন্তরণ, বাঁক পার হয়ে বারবার অন্য এক বাঁকে; অনন্তবদলরূপ জীবেদের ডাকে শুধু ডাকে। আকৃতিবদল যদি বোধের ধরন সিদ্ধকাম মুনিঋষি বা বৈয়াকরণ মুহূর্তের রথযাত্রী, অনিত্য গড়ন, মূর্ত আর বিমূর্তের বিবিধ বাস্তবে; নীড় ভেঙে নীড়ে যাই সৃষ্টি কলরবে। ভ্রমণ মরণ নয়, মরণ ভ্রমণ : জন্মমৃত্যু নির্ধারিত দুই ইস্টিশন; সুরতবদল করে নিত্য পরিযায়ী সটান দণ্ডায়মান কিংবা শয্যাশায়ী পঞ্চভূতে যাত্রা অহর্নিশ: প্রাণীরা আহার-ঘ্রাণ ভেষজ-আমিষ। তারপর একদিন শীতলপাটিতে যদি মাটিতে বিলীন, মানুষ বদলযাত্রী রূপে রূপে দিগন্তে আসীন।
-
আমার আবেগ
(আবুল হাসনাত স্মরণে) তুমি দেখেছিলে একা, জেনেছিলে কতকিছু জীবনের দ্বন্দ্ব থেকে পেয়ে গেছো জ্ঞান আর স্মৃতি মাঝে মাঝে সেইখানে নেচে গেছে স্মৃতির চড়ুই – জেনেছিলে এই সত্য – সময় চলেছে উড়ে ক্রূরচোখ ঈগলের মতো – রূপসীর রূপের জাদুও তার নখে ছিঁড়েখুঁড়ে যায়, মানবশরীরও বাঁচে না শুধু হৃদয় বাঁচে অন্যদের হৃদয়-গভীরে তোমার নশ্বর দেহ চলে…
-
আবুল হাসনাতের স্মৃতির উদ্দেশে
বাংলা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেছে কিন্তু বাঙালির মন পুরোপুরি দু-টুকরো হতে পারেনি। বাঙালির মনকেও ভেঙে দু-টুকরো করার জন্য আকাশে পতাকা তোলা হচ্ছে। ভয়াবহ সব ধর্মপতাকা। সেইসব অগণিত ভাঙনের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে যাঁরা হাহা করে বিদ্রূপের হাসি হেসেছেন আপনি ছিলেন তাঁদের একজন। আপনার পতাকার নাম ছিল কালি ও কলম। পতাকাটি চিরদিন উড়বে …
-
আকাশই শুধু
প্রত্যেক মানুষ গাঙচিল যদিও তা স্বীকার করে না। শেষ অব্দি তার কাজ শুধু উড়ে যাওয়া। অন্য মানুষেরা মাটি থেকে আবছা দ্যাখে তাকে। মানুষ ও নীল এক হয়ে যায়। গাঙচিল ও মানুষ এক হয়ে যায়। থাকে না আকাশ বলে কিছু আর। অথবা আকাশই শুধু থেকে যায়। মানুষ তো সম্পাদক – অনেক উপর থেকে দেখতে পায় গাছ…
-
মাহমুদ আল জামানের কবিতা
শিরোনামহীন আমার রোদ্দুর ঢেকে যাচ্ছে কালো মেঘে হায় ছায়াবৃতা দাও, আমাকে দাও সজীব সহজ উজ্জ্বলতা ঘুম নেই চোখে, তাকিয়ে থাকি অক্সিজেনের মিটারে। * ওপরের কবিতাটি হাসপাতালে শুয়ে শেষ লেখা কবিতা। কবিতাটির কোনো শিরোনাম দেননি কবি; তাই শিরোনামহীন নামেই প্রকাশিত হলো। ঝড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটাকে মেলাবেন? মালতী সেদিন অপরাহ্ণের রোদে উদ্বাস্তু হলো নদীর স্রোত আর…
-
পাখি ও বৃক্ষ
সুকান্ত বিশ্বাস পাখির কাছে বৃক্ষের ঋণ বৃক্ষ তাই পাখির জন্যে বোধিজ্ঞানে ধরে রাখে পাতার পালকে বোনা ভালোবাসা আকাশের নিচে আমরা সবাই কেউ পাখি কেউ বৃক্ষই তো!
-
চিটাগাং
আমি মোবাইল ফোন বন্ধ করে চার্জ দিলে তুমি খুব টেনশন করো। কক্সবাজার থেকে ফিরতে কখনো দেরি হলে আগ্রাবাদ থেকে চলে আসো চিটাগাং ক্লাব। আমার খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত তোমার অস্থিরতা কমে না, কমে না। আমি যেই চেরাগী পাহাড় মোড়ে ঢুকি, আমি যেই কাজীর দেউড়ী এসে কবুতর ওড়ানোর গল্প বলি, ফ’য়স লেকের ভোরবেলা আর আসকার দিঘির…
-
জন্মঋণ
সেলিম মাহমুদ কত কিছুই তো পেলাম এই ফুল, ফল, নদী, গমের দানা, বাতাসের প্রণোদনা, ভোঁস ভোঁস জ্বালানির জ্বলা, কাঠের বাক্স, খাদ্যক্যালোরি, আইসক্রিম, মাংসের চাপ-কিমা। কত না পথ, কত দেশ, জনপদ, ইতিহাসের ঘোরানো সিঁড়ি, ফাটা ডিম, মনস্তাপ, আংটি, পাতকূপ, সোনালি ঈগল, এসব কিছু, এক জনমে। কত কিছুই পেয়েই যাই, শুশুক, শুশুনি, আশাবরী, কামদ, তিলক, ঘণ্টাধ্বনি, সবুর…
-
উত্তরণ নামতা
রীপা রায় ধুলা-উড়ানিয়া মাটির টানে মিশে যাচ্ছে পাখির মাত। কোথাও কিছু জমছে ধ্বনি ফুটবে বলে অষ্টধাত। ব্যসনবোধির ব্যাপন দিন যাচ্ছে চলে ভালোয় ভালোয়। ট্র্যাপিজ ঘেরা কালক্ষেপণ অনুধ্যানে মৃদু লয়। পুত্রলাভে কুন্তির গান প্রকীর্ণ স্বর কুরঙ্গ লুট। বালিতটে সাগরলতা লাল কাঁকড়ার জটাজুট। মুদ্রার খেল নিপাট তাল শাস্ত্রের বোল গুলিয়ে গেল। সমুদ্র, আকাশ, মাটির ত্রিটান দোহার, গায়েন…
