কবিতা
-
চন্দ্রালোক
বলছি না যে এটুকুই শস্যভূমি,কিষানির আলতা পা যেখানে অরণ্য নাবিকেরা সব প্রচ্ছন্ন মৌন প্রশ্রয়ে নোঙর ফেলেছিল বাউল বিবাগে। বলছি না যে এটুকুই চন্দ্রালোক, এটুকুই তৃষ্ণা ও জলাধার মুছে যাবে সমস্ত ছায়ানীল কষ্ট তিলক। যে-কথাটি শিল্পস্বর হতে হতেও খাবি খাচ্ছে সারমেয়র পশমি করতলে – বলতে কি পারি যে সে কথাটিও কবিতার কিন্নরি পঙ্ক্তি হবে? হলে হোক…
-
ক্ষরণ
ভালোবাসা, মনে রাখা এত সহজ নয় এর জন্য শঙ্কাতুর হবারও কোনো মানে নেই। বনভূমি উজাড় হয়ে গেলেও অদৃষ্ট কাকে ফেরায়? মর্মে বাজে দুঃস্বপ্নের দাহ বছর শেষ হয়ে গেলেও মানুষের মর্মান্তিক পরিণতি থেকে মুক্তি নেই। শেষ ট্রেন ধরবে বলে যারা বেরিয়ে পড়েছিল তারাও মৌন হয়ে আশ্রয়হীন স্মৃতির প্রকোষ্ঠে পথ ও দৃশ্যসীমার ওপারে চলে যেতে চায়। একদিন…
-
যুদ্ধ যখন অহেতু ধেয়ে আসে
রোদ্দুরে ধুয়েছি গা প্রেমের ছোঁয়ায় বাতাসে উড়ছে মন ডানা মেলা পাখি নদীরাও কল্লোলিত মৃদু কুয়াশায় সমুদ্দুর পাড়ি দেয় হৃদয়-জোনাকি মানববসতি যদি গড়ে তুলি ঋণে প্রেমের বন্ধনে বাঁচি রাতে ও দিনে রক্ত দেখে কাঁপে বুক মানবার্দ্র মন তবু যুদ্ধ ভিত্তিহীন রক্তপায়ীগণ থামাও থামাও আজ যুদ্ধ-বিভীষিকা এ-জগৎ মানুষের চির-অধিবাস এক্ষুনি থামাতে চাই মৃত্যু-আণবিকা এ-পৃথিবী শান্তিময় স্বস্তির নিশ্বাস…
-
মরে যাব
বহুবিধ সকালে আমরা জেগে উঠে ঘুমের ভেতর – যেসব রাস্তায় অনেক প্রাাচীন গাছ বাপ-মাহারা গানের মতো স্বরলিপিহীন মূর্ছিত সবুজ স্মৃতির নীচে মানুষ নয়, রাক্ষসের আত্মা নিয়ে জাগে – তার ওপর দিয়ে বহুবিধ সকালে উড়ে খুঁড়ে আমি আরও কবি হতে হতে ঢাকার গাড়িতে উঠব তাই ভোরের রক্তের মধ্যে দলা পাকিয়ে আমরা ছুটেছি ঝিনেদা ৩ কিমি… আর…
-
আমায় নিয়ে লিখো
একটা পদ্য লিখো তো – বেশ বড়সড় একটা পদ্য, মহাপ্লাবনে ভেসে যাওয়া নুহের নৌকার মতো বিশাল। সেই পদ্যে আমায় ঠাঁই দিও, অন্য সবার মতো জোড়া নয়; একাকী থাকব আমি – ইচ্ছে হলে তুমি জোড়া মিলিও। অনন্তকাল ভাসতে থাকব তোমার পদ্য-তরীতে সকাল বিকাল রাতে ক্ষুধা তৃষ্ণাহীন আমৃত্যু। আমার জন্য একটা পদ্য লিখো। না হয় খুব দামি…
-
যার হদিস নেই
দূর অতীত যে অনতিক্রম্য, অগম্য, তার কাছে যাবার কোনো উপায় নেই, তবু, স্মৃতিকণায় যে ভরে থাকে মন, ভবিতব্যের হাতে সবকিছু ছেড়ে দেই! কার মুখ আর দেখবো পেছন ফিরে – এই রুক্ষ, শূন্য, বিবর্ণাতুর অবেলায়, সবই ধোঁয়াশা এখন, কুজ্ঝটিকার মতো, নতমুখে ফিরে যাই অতীত আঙিনায়! কার মুখ জীবন্ত জেগে থাকে এই মনে কার ছায়া নিশিদিন পিছু…
-
বঙ্গনারী
শ্যামল শোভার নদী একে একে মেশে এসে যে সমুদ্রে শোভিত সে-সমুদ্রও অপলক দ্যাখে যার রূপের উদ্ভাস সে অতুল বঙ্গনারী, সবুজ কাঁটার ঝাড়ে গ্রীবাউঁচু ফুল। যদিও সৃজনীপ্রভা তার উপেক্ষিত স্বীকৃতির প্রতিবন্ধী চোখে জীবনের খরপথে অবিরাম হেঁটে হেঁটে বিক্ষত পা প্রকৃতিপ্রেম ও শিল্পচেতনার নিভৃত আকর সে জ্বলে প্রেমের মোতি প্রেমিকের চোখে সে তার আপন চোখে ছেঁড়ে তবু…
-
সব শিল্প আত্মপ্রতিকৃতি
(হোর্হে লুইস বোর্হেসের দি মেকার গ্রন্থে পাওয়া একজনের কাহিনি) তার বেঁচে-থাকা ছিল মহাবিশ্ব অংকনের ব্রত এঁকেছেন চিন্তাস্রোত, স্বপ্নরেখা, দর্শনের ধারা স্বর্বংসহা মৃত্তিকার বহুস্তর শরীর ও মন প্রেমের চোখের মতো তারাদের ঠোঁটচাপা হাসি চাঁদের উপুড় বাটি, পাহাড়ের ধ্যানের আলোক এঁকেছেন যুদ্ধজাহাজ, বারুদের জটিল ভাণ্ডার প্রাসাদের হাড়গোড়, মৃত কূপ, শূন্য আস্তাবল পড়ন্ত স্তনের মতো সিঁড়িধাপে থিতু অন্ধকার…
-
দ্বিধাঘোর
হয়তো আমার চোখমুখে ছিল আবেগের গাঢ় রেখা – চাঁদজ¦লা রাতে আলোর ইন্দ্রজালে যখন ছিলাম নিবিড় স্বপ্নে ডুবে দুজনে হেঁটেছি নীরবেই পাশাপাশি, সেটুকুই ছিল অর্জিত অধিকার – তবু মনে হলো কোথাও গহনে তার রয়ে গেছে দ্বিধাঘোর নাকি সে নিজেই ছিল দর্পিতা আরো – চোখ তার ছায়াময় খুঁজেও পায়নি মিলন-মাধুরী প্রিয় রয়েছে যা আঁকা মহাকাল মুখজুড়ে –…
-
মহাত্মা গান্ধির প্রতি
সমস্ত যৌবন আপনার কথা ভেবেছি, গান্ধি! অনেক ভাবনায় ভুল ছিল – কিছু ভাবনা পার হয়েও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি আজো। অস্ত্র যেখানে দুর্বলতা হিংসা যেখানে পঙ্গুত্ব গোপনীয়তা যেখানে ক্ষুদ্রতা ষড়যন্ত্র যেখানে কাপুরুষতা সেখানে সূর্যালোকিত দেশ নীল অন্তহীন আকাশ সত্যের অপার সৌন্দর্য আর একজন একলা-মানুষ – আপনি – মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। আপনি যতখানি ইংরেজদের বিরুদ্ধে…
-
এক জন্মে ভবিতব্য
এক জন্মে ভবিতব্য, অন্য জন্মে পরিখার খাদ এভাবেই প্রতিবিম্ব, এভাবেই ধূলির সংহিতা মহাসড়কের পাশে ছুটে-চলা গ্রহণের চাঁদ অচেনা, অদ্ভুত গ্রীবা, অসমাপ্ত অমিল কবিতা এভাবে প্রলাপবাক্য; খসে পড়ছে তোমার আকাশ দু-চারটে ঝরাপাতা, বৃষ্টিদিন ভিজে যাচ্ছি একা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, শূন্যতার এই অধিবাস আমাকে শেখায় মন্ত্র, এ-জীবন এভাবেই দেখা তবুও কুয়াশাশেষে ভোরবেলা শিশির সম্পাত যদি হতে পারি…
-
বর্ষ-আবাহন
মহড়া চলছিল আগেই – বারোটা বাজতেই রাত আর রাত্রি থাকলো না স্নিগ্ধ-মোলায়েম – কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ ছিল আগের মতোই – স্কাইস্ক্রেপার পেরিয়ে সে থমকে দাঁড়ায় নগর-গলির আকাশে; আসছে নতুন বছর – উন্মত্ত মানুষ শব্দ আর বারুদের গ্রেনেড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই নতুনের ওপর; নতুনের কেতন গেল ছিঁড়ে – হল্লা-চিৎকারে মুহূর্তেই চরাচর উন্মত্ত – রাত টালমাটাল –…
