স্মরণ
-

মাহমুদ আল জামান ও আবুল হাসনাত : এক কাণ্ডের দুই শাখা
আবুল হাসনাতের আগে আমার মাহমুদ আল জামানের সঙ্গে পরিচয়। সত্তরের দশকের প্রথম দিকেই জানতাম মাহমুদ আল জামান কবিতা লিখতেন, লিখতেন ছোটদের জন্যও। এটুকু জানতাম কিশোর বয়সেই দৈনিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী ছিলাম বলে। তবে মাহমুদ আল জামানই যে সম্পাদক ও শিল্পকলা বিষয়ক লেখক আবুল হাসনাত সেটা জানতে আমার কিছু দেরি হয়েছিল। বাংলা…
-

আবুল হাসনাতের প্রতি শ্রদ্ধা
গুরু বলে কারে প্রণাম করবি আমার মন তোর অতীত গুরু, পথিক গুরু, গুরু অগণন – সুধারাম বাউল দীর্ঘ, সর্পিল সাহিত্যযাত্রা আমার। মেডিক্যালের ছাত্র পথ ভুলে চলে এসেছিলাম সাহিত্যের পাকচক্রে, সাহিত্যকে করে তুলেছি জীবনযাত্রার অনিবার্য অংশ। সেই পথচলায় কতবার, কত জায়গায় পথ হারিয়েছি। কোনো কোনো বাঁকে নেপথ্যে শুনেছি কে যেন বলছে – ‘পথিক তুমি কি পথ…
-

পর্দার অন্তরালের মানুষ হাসনাতভাই
হাসনাতভাইয়ের সঙ্গে কবে প্রথম আলাপ হয়েছিল এখন আর মনে করতে পারছি না। তবে লেখালেখি নিয়েই যে সে-আলাপটি হয়েছিল তা অনুমান করতে পারি। সে- সময়টায় আমি অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় প্রায়ই লিখতাম। তিনিই বললেন তাঁর সাহিত্য সাময়িকীতেও লিখতে। সেভাবেই শুরু। এরপর তাঁর পাতায় বাংলাদেশের বাজেট, কৃষি, দারিদ্র্য, রবীন্দ্রনাথ, অমর্ত্য সেনসহ কত বিষয়েই না…
-

আবুল হাসনাত কিংবা মাহমুদ আল জামান
এ কেমন আকাল! এ কোন করোনাকাল! অনাদি অনন্ত অক্সিজেন আমাদের শ্বাসকষ্ট ঘোচাবে না? একটুখানি শ্বাসকষ্ট নিয়েই হাসনাতভাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল, তিনি হাসপাতালে থাকতে চাননি, বাসায় ফিরতে চেয়েছেন। বাসায় ফেরা হয়নি; তবে তাঁকে হাসপাতালেও আর যেতে হবে না। তাঁকে যে যেতে হবে না – এটাও তো একটা ভালো খবর। টোয়েন্টি টোয়েন্টির মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত…
-

কবি ও সম্পাদক আবুল হাসনাত
কবি মাহমুদ আল জামান নামটি ছদ্মাবরণ হলেও খুব কি অচেনা? নিশ্চয় নয়। নিভৃতচারী এই কবিকে ছদ্মনামেই চেনে বাংলাভাষার কাব্যবিশ্ব। অপরদিকে আদর্শবান এক সাহিত্য-সম্পাদক, যিনি আবুল হাসনাত নামে অধিক পরিচিত। অত্যন্ত বাক-প্রমিতি, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ মননের এক অসাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দেশের কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের মনে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন সগৌরবে। ফলে পোশাকি নামটি পরিচিতি পেয়েছে…
-

সৃষ্টি-সন্ধানী আবুল হাসনাত
আমৃত্যু আবুল হাসনাত স্বভাবে ছিলেন নিভৃতচারী এক কর্মযোগী। তাঁর বহুপল্লবিত সৃষ্টিশীল সুকৃতি ও উত্তম সম্পাদনা সারস্বত সমাজে ক্রমশ সুখ্যাত হয়ে ওঠে। তাঁর মতো তন্নিষ্ঠ, পরিশ্রমী, পরিচ্ছন্ন সাহিত্য সম্পাদক বরাবর এদেশে বিরল। প্রকৃত সাহিত্য-শিল্পের নিপুণ সমঝদার ছিলেন এই স্বল্পবাক মানুষটি। প্রকাশযোগ্য লেখা নির্বাচন তিনি নিয়ত যত্নশীল পাঠে নির্ধারণ করতেন। অধ্যবসায় থেকে তিনি অর্জন করেন নিজস্ব ধীশক্তি।…
-

বিদায়ব্যথার ভৈরবী
আবুল হাসনাতকে আমি বরাবর ভাই বলতাম, তিনি বলতেন বন্ধু। যদিও বয়সে আমি ছোট, তিনি বরাবর ‘আপনি’ এইভাবে সম্বোধন করতেন, বলেকয়েও তাঁকে দিয়ে ‘তুমি’ বলাতে পারিনি। প্রথম পরিচয় ১৯৭২ সালে, মুক্তিযুদ্ধের পর পুরানা পল্টনে ছাত্র ইউনিয়নের নতুন কার্যালয়ে। আমরা তখন ব্যস্ত জয়ধ্বনি এই নামে একটি ট্যাবলয়েড সাইজের কাগজ ছাপাতে। প্রায় প্রতিদিন বিকালে এখানে আসা হয় অভিন্নহৃদয়…
-

মৃত্যুঘোর : আমাদের সব গোলমাল হয়ে গেল হাসনাতদা
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত ‘কেন?’ কবিতায় এই বাক্যগুলো লিখেছিলেন – কেন অবেলায় যাবে? বেলা হোক, ছিন্ন করে যেও সকল সম্পর্ক। যেন গাছ থেকে লতা গেছে ছিঁড়ে একটি বিষণ্ন লোক থাকে যেন হাস্যময় ভীড়ে কেন অবেলায় যাবে? বেলা হোক, ছিন্ন করে যেও সকল সম্পর্ক। এই কবির মতোই, তিন অভিন্নহৃদয় বন্ধু অবেলায় পরপর চলে গেলেন। প্রথমে…
-

কয়েকটি সাক্ষাতের স্মৃতি
হাসনাতভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় মস্কোয় ১৯৮৬ সালে। বোধ করি ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে – শীতের ঠান্ডা তখনো পুরোমাত্রায়। গণসাহিত্যের সম্পাদক হিসেবে তাঁর নামের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম, কিন্তু সরাসরি সাক্ষাৎ সেই প্রথম। মস্কোয় তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে এসেছেন সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম। তাঁরই বাসভবনে এক সন্ধ্যায় ডাক পড়ল। সেখানে এর আগেও বারকয়েক গিয়েছি। তিনি…
-

হাসনাতদা
বিশ্বব্যাপী অতিমারীর কারণে দীর্ঘকাল ধরে বাড়িতে বন্দি। এই অবসরে নিজের অসমাপ্ত কাজগুলো গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করছি। তারপর প্রায় মাস আষ্টেক বাদে হঠাৎ একটা জরুরি কাজে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় চলেছি ভাড়া-করা বাহনে। বহুদিন পরে বিস্তীর্ণ খোলা আকাশের নিচে। চারদিকে ঝলমলে রোদ্দুর, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত্রের পরে তাল-খেজুরের সারি, কিছুটা দূষণমুক্ত বলে আকাশের রং ঘন নীল – অনেকদিন…
-

‘অনেক মাইল ব্যেপে পৃথিবীর রাঙা দীর্ঘশ্বাস’
নিকটজনের মৃত্যু ভিন্ন এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। যেসব মানুষের স্নেহ-মমতা আমরা একটু বেশি মাত্রায় পাই, তাঁদের মৃত্যু বেশি আঘাত দেয়। আর সেই আঘাত এতটা গভীর হতে পারে যা আগে থেকে কিছুই অনুভব করা সম্ভব নয়। অনেক গুণী মানুষ থাকেন সমাজে যাঁদের হারালে ক্ষতি হয় সমাজদেহের, কিন্তু কিছু কিছু গুণী মানুষ থাকেন যাঁদের বিদায় শুধু যে ক্ষতিই…
-

প্রিয় হাসনাতভাই
সাতমসজিদ রোডে ছায়ানটের অপরিসর আঙিনায় জনাপনেরো নারী-পুরুষ। সকাল থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। মাস্ক-মোড়া মুখে কয়েকজনকে চেনা-চেনা লাগলেও আমার দৃষ্টি অদূরে লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে ওটার ডালা আটকানো সারা, মৃদু শব্দে ভ্যানটা পিছিয়ে মূল রাস্তায় গড়িয়ে নামতে বাকি। কে যেন এগিয়ে এসে বললেন, দেখবেন? আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে ঘড়ি দেখছি, এখানে তো আরো আধঘণ্টার মতো থাকার…
