স্মরণ
-

হাসনাতভাই
নবাবপুরের মাঝামাঝি পশ্চিম দিককার এক রাস্তায় মানসী সিনেমা হল। মানসী হলের নাম তখন ছিল ‘নিশাত’। এই হলের ঠিক উলটোদিকে লোহার বিশাল একটা গেট, টিনশেডের দৈনিক সংবাদ অফিস। যতদূর মনে পড়ে তখন বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ কিছুটা শুরু হয়েছে। ১৯৭৫-৭৬ সালের কথা। তখন দুটো দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা অত্যন্ত জমজমাট। একটি দৈনিক বাংলার সাহিত্যপাতা, আরেকটি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য…
-

সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত
প্রারম্ভে কিছুটা ভণিতা। নেত্রকোনার কুমড়ি পল্লিতে আমার জন্ম হয়েছিল আমার নানাবাড়িতে। সেই বাড়িতে একটি বিশাল কোঠা ছিল। তখন প্রায় পরিত্যক্ত এই কোঠায় কাঠের একটি আলমিরা ছিল। একেবারে শৈশবে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একদিন সেখানে লুকোতে গিয়ে আলমিরাটা খুলে ফেলেছিলাম। তখন সহসা সেখানে আমি অনেক পত্র-পত্রিকা দেখতে পাই। দেখে বেশ অবাক হই। আমার শিশুমন কিছুটা ভয়ও পায়।…
-

নীরব-সরব মানুষটি
ঢাকার বাইরে থাকি। ঢাকায় এলেই সুবীরকে (বেঙ্গল শিল্পালয়ের প্রয়াত পরিচালক সুবীর চৌধুরী) ফোন দিই : সুবীর, ঢাকায় এসেছি, একদিন আড্ডার আয়োজন করো। সাধারণত সেদিনই আয়োজনটি হয়ে যেত, কারণ সুবীরের আগ্রহ আমার চেয়ে কম নয়। আড্ডায় সস্ত্রীক আমি ছাড়া অবশ্য-সদস্য কাইয়ুম স্যার (আমার শিক্ষক হলেও পরবর্তীকালে বন্ধুসম), তাহেরা ভাবি (কাইয়ুম চৌধুরীর স্ত্রী) আর হাসনাতভাই। অনিয়মিত হলেও…
-

তিনি সম্পাদকদের সম্পাদক
আমার একটি বইয়ের উৎসর্গ-পাতায় আবুল হাসনাতের পরিচিতি এভাবে তুলে ধরেছিলাম : ‘সম্পাদকদের সম্পাদক’। বইটির পেছনে তাঁর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে তাঁরই আগ্রহে আমার যে আরেকটি বই বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে বেরিয়েছিল, যার বিষয়বস্তু ছিল শিল্পকলা, তার পেছনেও তো তিনিই ছিলেন অনুপ্রেরণা। সেই ১৯৭৫ সালে গণসাহিত্য পত্রিকায় কামরুল হাসানের ওপর একটা লেখা আমাকে দিয়ে না লিখিয়ে…
-

এক বিদগ্ধ রুচিমান ভদ্রলোক আবুল হাসনাত
কয়েকদিন আগে কালি ও কলম পত্রিকার সহকারী সম্পাদক আশফাক খান সাহেবের কাছ থেকে একটি ই-মেইল বার্তা পাই যে কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাতকে স্মরণ করে একটি বিশেষ সংখ্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে যদি আমি ওঁর সম্পর্কে একটি ছোট লেখা লিখি – এই অনুরোধ। সঙ্গে লুভা নাহিদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি, যা পড়ে জানতে পারলাম…
-

মিত্রমশায়, অন্য কিছু লিখুন
গত নভেম্বরের ১ তারিখে কালি ও কলম সম্পাদক, কবি, প্রাবন্ধিক আবুল হাসনাত প্রয়াত হয়েছেন নিউমোনিয়া হয়ে; শুনছি করোনা, আবার করোনা নয়। তিনি ঢাকার মানুষ। ঢাকা বিদেশ তো সত্য। ভিসা না হলে যাওয়া যায় না। আর করোনাকালে তো সেই শহর আমার এই কলকাতা শহর থেকে দূর-দূর লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ভারত আলাদা দেশ। কিন্তু…
-

আবুল হাসনাত : দূরের ও কাছের মানুষ
‘আবুল হাসনাতভাই নেই। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। এই তো দেখা হলো গত ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির সাধারণ সভায়। আমাদের সাহিত্যচর্চার পথে একজন অভিভাবক বিদায় নিলেন। দেখা হলেই বলতেন, লেখা দিয়েন। তিনি ছিলেন লেখক তৈরির কারিগর। সংবাদ সাময়িকীতে তিনি আমার প্রচুর প্রবন্ধ ছেপেছেন। রাজশাহী থেকে ঢাকায় গেলেই লেখক সম্মানী দ্রুত পরিশোধ করার ব্যবস্থা করতেন। কালি ও কলমের দক্ষ…
-

একদিন
একদিন দিকচিহ্নহীন বিষণ্নতায় দেখেছি নৈরাশ্য কথা বলছে ভাঙা শরীরের সঙ্গে অলীক বিশ্বাস দোল খায় তুলসীমঞ্চ ও ধ্বংসস্তূপে ঘাতকের হাতের থাবায় পূর্ণিপুকুর, দলিল দস্তাবেজ, ঘরদোর, পাঁজিপুথি উধাও হলো আর্তনাদ আর বর্বরতায় বুনো পশু ছিন্ন করলো মালতী আর মিনতির দেহের সুষমা জীর্ণ ও শীর্ণ হয়ে যন্ত্রণায় স্মৃতির পথরেখা হয়ে সীমান্তের দিকে হারিয়ে গেল ডাবল-ডেকার বাসে যে তরুণী…
-

আবুল হাসনাত আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন
হাসনাতভাই, এই তো মনে হয় সেদিনের কথা। এক সন্ধ্যায় আমাদের ঢাকার বাসায় বসে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে পুরনো ঢাকার কিছু স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন। বিশেষ করে বলছিলেন আপনাদের একসময়ের প্রতিবেশী ডাক্তার নন্দী, তাঁর শিক্ষিকা স্ত্রী এবং তাঁদের দুই কন্যা ইন্দিরা ও মন্দিরার কথা। প্রসঙ্গটা এলো কেননা ঢাকার স্মৃতি নিয়ে এত বছর পরে লিখিত মন্দিরার একটি বই সম্প্রতি আপনি…
-

সম্পাদকের ব্যাপ্তি ও উচ্চতা
হঠাৎ তাঁর ফোন পেতাম। বুঝতাম লেখা চাইবেন। ঠিকই বিশেষ কোনো উপলক্ষে লেখার অনুরোধ জানাতেন এবং তারপর মাঝে মাঝে তাগাদা দিতেন। প্রথমে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতার জন্যে, তারপর গত সতেরো বছর ধরে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্যপত্র কালি ও কলমের জন্যে। যতদূর মনে পড়ে একসময় মাসিক গণসাহিত্যের জন্যেও চেয়েছেন লেখা। হাসনাতভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় অনেক দিনের…
-

আবুল হাসনাত প্রীতিভাজনেষু
কথাটা আপনাকে বলতে বড়ো দেরি হয়ে গেল। সেদিন থেকেই আমার অস্বস্তি কাটেনি। সকালবেলায় আপনি আমাদের বাড়িতে এলেন। সুন্দর গল্প-কথাবার্তা হলো। আমার স্ত্রী ঢাকার মানুষ। ঢাকার মানুষজন পেলে তিনি কত খুশি হন। এক সময়ে হায়াৎ আমাদের বাড়িতে আসতেন। একে তো যাদবপুরের ছাত্র। তাছাড়া আমাদের সুবীরের বন্ধু ও তার সঙ্গে গবেষণা করা লোক। আমাদের বেশ আড্ডা ছিল…
-

সাঁকোপথে এক স্বপ্নজন
এক. বর্ণমালার সাঁকোপথে শামসুর রাহমানকে প্রশ্ন করেছিলাম, আমরা আপনার বই এখানে পাই না কেন? আপনার মানে, আপনাদের। বাংলাদেশের লেখক-কবিদের বই কলকাতায় পাই না কেন? প্রশ্নটা করে ফেলার পর নিজেকে বেশ বোকা লাগল। আদতে যা। ভেবে-টেবে প্রশ্ন করিনি, পাশাপাশি হাঁটা ও গল্প করার মধ্যে হঠাৎই উঠে এসেছিল। তখন বিকেল। আজ থেকে পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বা আরো আগে। এটা…
