প্রবন্ধ
-

গালির ভাষায় গলাগলি
কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, তিনি মানুষের গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করতে চান। তা ঠিক আছে। কিন্তু বাংলা শব্দ গালাগালি থেকে এসেছে গালি-শব্দ রূপছোট হয়ে। গালি আর গালাগালের আভিধানিক অর্থ এক নয় কিন্তু। গালাগাল অর্থ ভর্ৎসনা। এটির মাত্রা বেশ লঘু। গালি কিন্তু ভর্ৎসনার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র! কখনো এটি হয়ে ওঠে আক্রমণের ভাষাও। তাই বাংলা ভাষায় গালি…
-

গণমাধ্যমের ভাষা ও ভেলকি
মাধ্যমই বার্তা, আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া : দ্য এক্সটেনশন অব ম্যান বইয়ে ১৯৬৪ সালে যখন কানাডীয় তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান ঘোষণা করেছিলেন, কথাটাকে শুনিয়েছিল কুজ্ঝটিকার মতো। গণমাধ্যমের জগতে পত্রিকাই তখনো সর্বেসর্বা। পত্রিকার বাইরে আর দু-চারটি উদ্যোগ গণমাধ্যমের পরিসরে স্পষ্ট আকার নিয়ে মাথা তুলতে শুরু করেছে। রেডিও শুরু করেছে কিছুটা আগে। মোটামুটি ১৯৩০-এর দশকে। এর কিছুটা পরে টেলিভিশন আর…
-

আদিবাসীদের মাতৃভাষার প্রতি যত্ন ও ভালোবাসা
এক পৃথিবীতে মায়ের ভাষার চেয়ে মধুর আর আবেগের কীআছে? ‘মাতোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো, মাতোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ –শৈশব থেকে একটি গারো, হাজং, সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী শিশু এই জাতীয়সংগীত গেয়ে বড় হয়। পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে তার মাতৃভাষা মধুর। একটি গারো…
-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ পাঠক্রমের রাজনীতি : জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ
বঙ্গভূমিতে উচ্চতর শিক্ষার সূচনা মূলত উনিশ শতকের মাঝামাঝি। উনিশ শতকে কলকাতাসহ কয়েকটি বড় শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ স্থাপন এবং শতকের মাঝামাঝি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েরপ্রতিষ্ঠা (১৮৫৭) বঙ্গে জ্ঞান চর্চাকে এক নতুন মাত্রায় উত্তীর্ণ করে। শুধু বঙ্গ নয়, আফগানিস্তান থেকে বার্মা পর্যন্ত সমস্ত উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের কর্তা ছিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ভারত বর্ষে তথা বঙ্গে একটি দেশীয় মধ্যবিত্ত-সমাজ সৃষ্টির চেষ্টা…
-

মুক্তিযুদ্ধের কলকাতার মন – একটি নব-পরিচয়
মন তো মানুষেরই হয়। তা বলে কি জনপদের কোনো মন থাকতে নেই? মুশকিল হলো, জনপদবাসী কোনো একক নয়, সমষ্টি। সকলের মন একই রকম কলে ছাঁটা হবে, একই ক্ষুরে সবাই মাথা কামাবে – এমনটা ভাবার কোনো সংগত কারণ দেখি না। ইতিহাসের পাতা তলিয়ে দেখলে টের পাই, যারাই এমনটা ভেবে বসেছেন তারাই ডুবেছেন। এমনকি যুদ্ধ বা রাষ্ট্রবিপ্লবের…
-
একুশের সংকলন – একটি দুর্লভ পুস্তিকা
কবি হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশের প্রথম সংকলনের কথা সর্বজনবিদিত। ১৯৫৪ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছিল। পুঁথিপত্র প্রকাশনীর পক্ষে তার প্রকাশক ছিলেন ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সৈনিক ও পরবর্তীকালে সমাজতন্ত্রের স্বাপ্নিক বামপন্থী নেতা মোহাম্মদ সুলতান। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সেই সময়ের তরুণদের প্রতিবাদী, সংগ্রামী ও দীপ্তিময় লেখা ও কবিতায় উচ্চকিত একুশের এই সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারী অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিল। অনস্বীকার্য…
-

গীতগোবিন্দ
বাংলা কাব্য-রূপান্তর : অসীম সাহা সূচনা পর্ব ভূমিকা [জয়দেব। পুরো নাম জয়দেব গোস্বামী। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার অজয় নদের তীরে কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কেউ কেউ আবার তাঁকে উড়িষ্যার মিথিলার অধিবাসী বলেও মনে করেন। জানা যায়, তাঁর পিতার নাম ভোজদেব এবং মাতার নাম বামাদেবী। তাঁর স্ত্রীর…
-

রবীন্দ্র-ভাবনায় জনস্বাস্থ্য
জীবনের শেষ বছর অর্থাৎ ১৯৪১ সালে শান্তিনিকেতনে বসে রবীন্দ্রনাথ ‘জন্মদিনে’ নামক অসামান্য কবিতাটি রচনা করেন। বিপুলা পৃথিবীর কতটুকুই বা জানেন তিনি, এই আক্ষেপ ব্যক্ত করার পর কবি ঘোষণা করেন, ‘আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি/ আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি’। সমগ্র জীবনের বিস্ময়কর সাহিত্যসাধনায় রবীন্দ্রনাথ এই ঘোষণার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। জীবদ্দশায় ম্যালেরিয়া,…
-

আনিসুজ্জামান-জীবনকথা
একত্রিশ ১৯৯৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর মামাতো বোন হালিমার মৃত্যুকালে আনিসুজ্জামান ছিলেন কলকাতায়। অবশ্য তার আগেই হালিমাকে শেষ দেখা দেখে গিয়েছিলেন তিনি হাসপাতালে। সে-সময় ‘কী যেন সে বলতে চেয়েছিল আমাকে’ – সে-কথা আনিসুজ্জামান আর জানতে পারেননি। বিপুলা পৃথিবীতে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৫ সালের পরে, বিশেষ করে জীবনের শেষ দিকে, দেশ সম্পর্কে তার উদ্বেগ অনেক বেড়ে যায়, কবিতায়…
-

প্রেমেন্দ্র মিত্রের জনপ্রিয় চরিত্র ঘনাদা
কলকাতার ৭২নং বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ি। সেখানেই জমাটি আড্ডা। আড্ডায় ঢুকে কারো কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে তাকে ধন্য করে দামোদরের বন্যার প্রসঙ্গটাকে কেড়ে নিয়ে তাহিতি দ্বীপের টাইডাল ওয়েভ বা ভয়ংকর সমুদ্র-জলোচ্ছ্বাসে নিয়ে গিয়ে ফেলেন বিস্ময়াহত মুখ্য শ্রোতাদের এবং আমাদেরও। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ঘনাদা ওরফে ঘনশ্যাম দাশ, যার রূপকার প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রেমেন্দ্র মিত্রের জন্ম…
-

নাসরীন জাহানের ছোটগল্পে মৃত্যুচিন্তা
আশির দশকের বাংলা ছোটগল্পে এক স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত নাম নাসরীন জাহান (জন্ম ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ)। কৈশোর থেকে তিনি বিশ্বসাহিত্য মন্থন করে তিলে তিলে নিজেকে প্রস্তুত করেন। তাঁর পাঠস্পৃহা, শ্রম-নিষ্ঠা এবং সহজাত বিরল সৃজনক্ষমতা অল্প বয়সেই তাঁকে এক বিস্ময়কর পরিপক্ব লেখকের মর্যাদা দিয়েছে। তাই রূপমের সম্পাদক আন্ওয়ার আহমদ কিশোরী নাসরীনের লেখা পড়ে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার পুরুষ গল্প অনেক…
-

বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী এবং উপনিবেশমুক্তির যাত্রা
পঞ্চাশ বছর আগে যখন বাংলাদেশ নামের দেশটির আবির্ভাব ঘটল, বিশ্ব-মানচিত্রে একটা জায়গা করে নিল, একে নিয়ে আমাদের যতটা প্রত্যাশা ছিল, আশাবাদ ছিল, বিশ্বের তা প্রায় ছিলই না। বিশ্ব বলতে আমি মোটা দাগে একটা বিভাজনের কথা বলব, এবং সযত্নে উপনিবেশী চিন্তার প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় বিশ্বের প্রকোষ্ঠকরণ থেকে একে সরিয়ে রাখব। এ-বিভাজনের একদিকে ছিল (এবং এখনো আছে) পুঁজিবাদ (এবং…
