April 2026

  • বুড়ি সোনাই, রুক্ষ দুপানি

    আমি কি বৃষ্টির সন্তান ছিলাম, নাকি প্রেমিক – কৃত্রিম ঝরনার কাছে এ খবর থাকবে না, শহুরে দৈনিকগুলোও ছাপবে না কোনো কিছু – মাঝে মাঝে নিজেকেও খুব অচেনা মনে হয়, শুধু খোলস আছে খোলসের ভেতর মানুষ, নাকি মাছি – কোথায় ছুটেছি কার পিছু? আমারও তো মাঝে মাঝে একা লাগতে পারে, এসব ওরা বোঝে না এসির বাতাসে কীভাবে নেব বৃষ্টি-হাওয়ার স্বাদ, এই অনিবার্য সন্ন্যাসে – চেনা রাস্তা, চেনা ঘর, শহরের সাজানো গাছপালা সব তবু লাগে অচেনা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে জানালায় হাত বাড়াই – দম বন্ধ হয়ে আসে। দুপানির কোলছাপা ঘোলাজল আর সোনাইয়ের কলকল স্বচ্ছ পানি জেনে রেখো তোমরা, একদিন এইসব হাঁসফাঁস অন্ধকার ছেড়েছুড়ে আবার আসবো ফিরে – ধূসর ছায়াপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ঠিকই জানি পৌঁছে যাব তোমাদের কাছে, কোলাহল থেকে দূরে নিমগ্ন মাটির ঘরে। হয়তো তখন স্রোতের আকাল – তোমরাও বন্দি পরাবাস্তব ফাঁদে, আর এই বুক বুড়ি সোনাই, রুক্ষ দুপানি – বেদনার মতো কাঁদে।

  • ন হন্যতে

    রৌদ্রঝলসিত চারণভূমির ঘাসে নগ্ন তুমি – শুয়ে যেন খোলা তলোয়ার ফুল ভ্রমে প্রজাপতি নরম বাতাসে ধীর উড্ডয়নে নামে ও বুকে তোমার গোপন নিশানাগুলো চিনে নিতে চাই কোথায় লবণ-খাঁড়ি, কোথায় আগুন সুখের মতন কোনো ব্যাধি আর নাই সুখ, তুমি ব্যাধি হও – কুন ফায়া কুন তুঁতপোকা, তুমি হও নরম রেশম – গভীর দিনের শেষে বিষাদ-সুন্দর; ন হন্যতে, ন হন্যতে, অয়ি বিহঙ্গম আমি হই বিষে নীল, কী ভীষণ জ্বর! যেদিকে তাকাই – দেখি, প্রিয় সেই মুখ আমার হয়েছে সখী, সুখের অসুখ।

  • সুপ্ত উচ্চারণ

    ‘ভালোবাসি’ বললেই শব্দটির আলো নিভে যায় জীবন ও মৃত্যু এসে একসাথে আঁট হয়ে বসে পুরনো কাগজ ওড়ে; ভাঁজে ভাঁজে লেখাজোকা আছে অঘোষিত স্বীকারোক্তি। বন্ধ চোখে সব দৃশ্যমান রাস্তার বিষণ্ন আলো ঝরে আছে অদূরের কাছে আমার নামের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে তোমার ছায়া রাত্রির ক্ষয়িষ্ণু চোখ। জানলা খোলা। মন লিখে ‘মন’ চাঁদের আলোয় দেখি – অর্ধেক তুমি, অর্ধেক আমি অসমাপ্ত চিত্র! কাকে কে দেখায় – বোধগম্য নয় মরুময়তায় আমি ভিজি, তুমি লিপ্ত অন্ধতায় তোমার বিদায়-হাসি মুগ্ধতার মৃত্যু ডেকে আনে, প্রেম ও বিচ্ছেদ একবিন্দুতে মেলে, ব্যাসার্ধ আঁকে … শুধু অনুভূত হয় অস্তিত্বের পরম পরতে – মুগ্ধতার চিহ্ন – বাধ্যগত নয়, বিমূর্ত উড়াল … কাঁচের গ্লাস। ঠোঁট ছুঁতেই চিড় ধরে স্বচ্ছতায় আলোর ছায়ায় মেলে চিরন্তন নিত্যসত্যতা যেখান সময়বৃত্ত নেই, আমরাই চিরবিদ্যমান আর থাকে ভালোবাসা অপলক সুপ্ত উচ্চারণে

  • মনাভিমন্যু

    রণে পার্থ কাঁদে একা, সখা দেখা দাও, গাণ্ডীব লাগছে ভার, পরান অসাড়! যুযুমান এ জীবন, আর কত বই! সংসার জতুগৃহ, নিষ্কৃতি মিলাও। রথ তুমি বয়ে চলো, পিছে আমি রই, পথের দিশারী তুমি, অনুগামী হই। কুরুক্ষেত্র দূরে নয়, হৃদি যুদ্ধাক্রান্ত, নিজের বিরুদ্ধে যুঝে, শোকাতুর পার্থ। এ জীবন চক্রব্যুহ, মন অভিমন্যু, ঢুকেছে শিবিরে একা, না জেনে কৌশল। শরীরে রয়েছে লেখা, শরীরের ঋণ, হৃদয়ে বইছো তুমি, কালকূটপ্রেম। রণে পার্থ বড় একা, প্রভু দেখা দাও, রথ তুমি বয়ে চলো, ডাকেন অর্জুন।

  • কাজল

    উল্টোচাঁদবাঁকা ভ্রুজোড়ায় নাচে লজ্জাবতী মায়ার কাজল, ঢালু বেয়ে চোখ; চোখের কোনায় জ্বলে অশ্রুকণা টলমল। লোনা অশ্রুকণাগর্ভে সৃষ্ট ঝরনা থেকে দরদি নয়ননদী – দুঃখী মোহানার টানে অসীমের বেদনায় মিশে যায় যদি … সেই শোকে আকাশের সবদিকে জমে গেলে বিষাদবাদল, নিচে কালো ছায়া পড়ে সাগরের রাগী চোখে বিরহকাজল।

  • অস্থায়ী ঠিকানা

    ভাড়াবাড়ির দেয়ালে পেরেকের পুরনো দাগ চিঠির বাক্সে জমে থাকে চিরচেনা ধুলো। নাম বদলাই, স্থান বদলাই, মোবাইলের সিম কার্ডের মেয়াদ ফুরোয়। বারান্দায় শুকোতে রাখা শার্টের মতো দুপুরের রোদে ঝুলে থাকে পরিচয়। একসময় যে উঠোনে ডাক পড়তো নামে, সেখানে এখন আগাছা ও নীরবতা। নদী বদলেছে পাড়, শহর বদলেছে মানচিত্র, আমিও বদলেছি ঠিকানা অগণনবার। না-খোলা চিঠিতে জমে থাকে পুরনো দেশ, অপঠিত কিছু আহ্বান, কিছু অনুতাপ। যে ঘর ছেড়েছি, সে-ঘরও কি আমাকে ছাড়ে? স্বপ্নে কখনো দরজায় কড়া নাড়ে অচেনা হাত। ভেতরে ভেতরে বুঝি, আমরা সবাই ভাড়াটে, শ্বাসের ভেতরেই কেবল অস্থায়ী বাস। দেহ এক খাম, ঠিকানা লেখা ক্ষণিক, প্রেরক অজানা, প্রাপকও অনিশ্চিত।

  • চারুকলা ভবন : বৈশ্বিক বাঙালির আত্মানুসন্ধানের রাজনীতি

    চারুকলা ভবন : বৈশ্বিক বাঙালির আত্মানুসন্ধানের রাজনীতি

    গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় মাজহারুল ইসলাম (১৯২৩-২০১২) স্থপতি হিসেবে তাঁর জীবন কিভাবে শুরু করেছিলেন? কী ছিল তাঁর জীবনদর্শন? স্থাপত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে তিনি কী ভাবতেন? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ মাজহারুল ইসলাম এমন একসময়ে আমেরিকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসেছিলেন, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি এবং ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলন তুঙ্গে। সেই পটভূমিতে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যচেতনা আর রাজনৈতিক দর্শনের সংযোগ কি ঘটেছিল? আর যদি ঘটেই থাকে, সেটা কিভাবে, তা জানা জরুরি। ১৯৫২ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ওরেগন, ইউজিন, থেকে মাজহারুল ইসলাম স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর বয়স তখন ঊনত্রিশ। এর আগে ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ শিবপুর থেকে পুরকৌশলে পড়াশোনা শেষ করেন। ইউজিন পর্ব সমাপ্ত করে তিনি বেশ কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরে বেড়ান – বিশাল দেশটাকে যেন বোঝার চেষ্টা করেন নবীন স্থপতির দৃষ্টিকোণ থেকে।  যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে মাজহারুল ইসলাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিল্ডিংস, কমিউনিকেশন্স, অ্যান্ড ইরিগেশন (সিবিআই) বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সরকারি বিভাগে তখনো স্থপতির পদ সৃষ্টি হয়নি। দেশে স্থাপত্যশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। মাজহারুল ইসলামই একমাত্র স্থানীয় স্থপতি, তাও আবার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের নির্মাণশিল্প ছিল আমলাতান্ত্রিক এবং তার নিয়ন্ত্রণকারী ছিল সিবিআই-এর সার্ভেয়ার, ড্রাফটসম্যান ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। তাঁদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন কলকাতা আর বোম্বের (মুম্বাইয়ের) কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। ১৯৪৮ সালে, দুজন ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড হিক্স (Edward Hicks) এবং রোনাল্ড ম্যাককোনেল (Ronald McConell) সিবিআই-এ স্থপতি হিসেবে যোগ দেন। এই দুজন ঢাকার নগর পরিকল্পনা প্রণয়নসহ বেশ কয়েকটি বড় স্থাপনার কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের চিন্তাভাবনা এবং কাজের ধারা, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্থাপত্যশিক্ষায় উদ্দীপিত মাজহারুল ইসলামকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি।  কাজে যোগদানের পর (১৯৫৩-৫৬) স্থপতি ম্যাককোনেল মাজহারুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন শাহবাগে গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ একটি জমিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চারুকলা শিক্ষাভবন অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমানে ফ্যাকাল্টি অফ ফাইন আর্টস) ডিজাইন করার জন্য।  দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক স্থাপত্যের উৎস নিয়ে যতদূর গবেষণা হয়েছে সেখানে সাধারণত চারুকলা ভবনকে চিহ্নিত করা হয় এদেশে নান্দনিক আধুনিকতার সূচনাকারী হিসেবে। কিন্তু এই ভবনটির বিমূর্ত আধুনিকতার সঙ্গে দেশভাগ-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ওতপ্রোত সম্পর্ক ছিল – সেটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। অর্থাৎ, পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাজহারুল ইসলামের নান্দনিক আধুনিকতার অর্থ কী ছিল? সেই আধুনিকতার উৎসটাই বা কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যেতে পারে চারুকলা ভবন বিন্যাসের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মধ্যে।  পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আধুনিক স্থাপত্যজগৎ কেমন ছিল তা খোঁজ করলে জানা যায় যে, মাজহারুল ইসলাম যখন ১৯৫৩ সালে চারুকলা ভবন ডিজাইন করা শুরু করেন, তখনো ফরাসি-সুইস স্থপতি ল্য কর্বুসিয়ের (Ronald McConell)-এর বিখ্যাত রনসাম্প চ্যাপেল (Ronchamp Chapel) তৈরি হয়নি। ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট (Frank Lloyd Wright, 1867-1959)-এর গুগেনহাইম মিউজিয়াম…

  • সময়ের দর্পণে শরৎশশী

    সময়ের দর্পণে শরৎশশী

    শুরুতেই বলে রাখা ভালো, এ-লেখাটি প্রচলিত ধাঁচের নাট্যসমালোচনামূলক লেখা হবে না। এ-লেখার সঙ্গে স্মৃতি-আবেগ যেমন থাকবে, তেমনি নাটকটির প্রযোজনার ত্রুটিবিচ্যুতি, সাফল্য-সম্ভাবনা সংক্রান্ত কিছু কথাও থাকবে। আজ দেশ নাটকের দর্পণে শরৎশশী নাটকটি নিয়ে দু-চার কথা লেখার চেষ্টা করব।  দীর্ঘ ৩৪ বছর পরে দেশ নাটকের দর্পণে শরৎশশী নাটকটি সম্প্রতি আবার দেখলাম। দীর্ঘদিন পর নাটকটি তারা মঞ্চে পুনরায় উপস্থাপন করেছে। ১৯৯২ সালে যখন নাটকটি প্রথমবার ঢাকার মঞ্চে আসে, সেই মঞ্চায়ন আর বর্তমানের মঞ্চায়নের মধ্যে পার হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক সময়কাল। এই সময়ের ব্যবধানে অনেক পরিবর্তন এসেছে সমাজে, নাটকে, সর্বক্ষেত্রে। তারপরেও প্রথম মঞ্চায়ন আর সাম্প্রতিক মঞ্চায়নের মাঝে যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। নাটকটি প্রথম যখন মঞ্চে আসে, তখন নাট্যকার মনোজ মিত্র একের পর এক অসাধারণ সব নাটক লিখে চলেছেন। নাটকটির নির্দেশক আলী যাকেরও প্রবল প্রতাপে নির্দেশনাদান ও অভিনয় করে চলেছেন। দর্পণে শরৎশশী নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র মনোরমার অভিনয় করতেন তখন ইশরাত নিশাত। মেধাবী তরুণ অভিনেতা-নির্দেশক-সংগঠক হিসেবে ইশরাতও তখন দারুণ দীপ্তিমান। ৩৪ বছর পর অভিনয় দেখতে গিয়ে বারবার এঁদের তিনজনের কথা মাথায় এসেছে। দেশ নাটক নতুন করে মঞ্চায়নের আয়োজনে ‘স্মরণে ও অনুসরণে’ শিরোনামে স্মরণিকা-ব্যানার ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে উল্লিখিত তিনজনকেই স্মরণ করেছে। এ-নাটকে অভিনয় করতেন বন্ধু জসিম উদ্দিন ও সুজাত কবীর। এঁরা দুজনও প্রয়াত হয়েছেন তরুণ বয়সে। এঁরা দুজনও স্মরণে-স্মৃতিতে জাগ্রত রয়েছেন।  পাঠকের কাছে এ-লেখাকে স্মরণসভার বক্তৃতার লিখিতরূপ বলে মনে হতে পারে, তবু কিছু কথা স্মৃতিকথা আকারে লিখতেই হচ্ছে। ওই যে আগেই বলে নিয়েছি, সময়ের যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয় না। এবার যাঁকে স্মরণ করতে চাই, তিনি হলেন, আবুল হাসনাত। আমাদের দেশের থিয়েটারচর্চায় তিনি ছিলেন নেপথ্যের এক কাপালিক। তিনি থিয়েটারের মুণ্ডুমালা গলায় না পরেও এদেশের থিয়েটারের যাতে মঙ্গল হয়, তা নিভৃতে কামনা করে গেছেন আমৃত্যু। ১৯৯২ সালে তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক। সেই সময়কে যাঁরা জানেন, তাঁরা এও জানেন, সাহিত্যসম্পাদক হিসেবে তিনি কতটা উঁচুমানের ছিলেন। সংবাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পাতাকে তিনি যে কতটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা তাঁর শত্রুরাও স্বীকার করতে বাধ্য। ভালো নাটকের সন্ধান পেলে সে-নাটকের রিভিউ তিনি পরম যত্নে দৈনিক সংবাদে ছাপতেন। পরবর্তীকালে তিনি মাসিক কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে একই কাজ করে গেছেন, আরো বিপুল আগ্রহে ও গুরুত্বের সঙ্গে। তিনি সব সময় লেখককে সম্মান করতেন। লেখকের কাছে নিজে লেখা চাইতেন এবং লেখা ছাপা হওয়ার পরে লেখককে যত দ্রুত সম্ভব লেখক কপি এবং লেখার সম্মানী পৌঁছে দিতেন। তিনি তাঁর পক্ষে সম্ভব সর্বোচ্চ সম্মানীটাই লেখককে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। দুঃখের বিষয়, তিনিও আজ আর আমাদের মাঝে নেই। নাটকটি দেখতে দেখতে বারবার তাঁর কথাও মনে পড়ছিল। তাঁর আগ্রহেই ১৯৯২ সালে দৈনিক সংবাদে এই নাটকটি নিয়ে আমাকে লিখতে হয়েছিল। আজ লিখছি কালি ও কলম পত্রিকার জন্য, যে-পত্রিকায় তিনি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। লিখতে বসে আজ সকল দিক থেকে তাঁর শূন্যতা অনুভব করছি।  দর্পণে শরৎশশী নাটকটির কাহিনি প্রায় একশ বছর আগেকার। খুব সাদামাটা কাহিনি। তবে এ-নাটক যেন অন্য এক কারণে দর্শককে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। মফস্বলে সৌখিন থিয়েটারচর্চাকারীদের থিয়েটার করা নিয়ে নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। নাটকের ভেতরে রয়েছে আরেক নাটক। কিন্তু তা যেন শুধু নাটকের কথাই বলে না; হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও সমাজেরই প্রতিবিম্ব। একশ বছর আগের গল্পের মধ্যেও প্রোথিত রয়েছে বর্তমান সময়। রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবার কখনোই যে আমাদের দেশে সংস্কৃতিবান্ধব ছিল না, এখনো নেই, তারই এক বয়ান যেন দর্পণে শরৎশশী। পরিবার কাঠামোর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকেও উন্মোচন করার প্রয়াস রয়েছে এ-নাটকে। পাঁচক্ষিরের জমিদার বিজনবিহারী। জমিদারি পরিচালনা করেন দক্ষহাতে। তার পুত্র ইন্দ্রনাথ কলকাতায় থাকেন। সেখানে থিয়েটার করেন তিনি। সেবার কোজাগরি পূর্ণিমায় ইন্দ্রনাথ নিজগ্রামে থিয়েটার করবেন গ্রামের লোকজন নিয়ে। তার আমন্ত্রণে নাট্যাচার্য গিরিশ ঘোষ কলকাতা থেকে আসবেন পাঁচক্ষিরেতে। এবারই প্রথম নারীরা অভিনয় করবেন গ্রামের এই থিয়েটারে। তাই কলকাতা থেকে দুজন নারীশিল্পীও এসে পড়েছেন। জমিদার বিজনবিহারী চিন্তায় পড়ে গেছেন, তার পুত্রের কর্মকাণ্ডে। ‘এ তো অনাচ্ছিষ্টি!’ জমিদারির সুনাম নষ্ট হবে। তার ওপরে টাকার শ্রাদ্ধ। যে করেই হোক থিয়েটার বন্ধ করা দরকার। আর কৌশলে গিরিশ বাবুর আসাটাও বন্ধ করা দরকার। গিরিশবাবু মান্যি মানুষ। তাঁকে অসম্মান করা যায় না। করলে বিজনবিহারী বাবুর জমিদারির দুর্নাম হবে। কোজাগরির রাতে থিয়েটার হতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত হতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে থিয়েটারের লোকজনের নিজেদের মধ্যের অন্তর্কোন্দল ও রাজনীতি।  নাটকের পুরো গল্প বলাটা এখানে জরুরি নয়। যেটুকু বলা হলো, তার নির্যাসটা বোঝা জরুরি। পরিবার কাঠামোতে যিনি বিজনবিহারী, রাষ্ট্রের কাঠামোতে তিনিই সরকার বাহাদুরের সবচেয়ে শক্তিমান ব্যক্তি। তিনি সবকিছু দক্ষহাতে সামলান। বাইরের দেশ বা সম্মানিতজনের সামনে তাঁর কিংবা তাঁর জমিদারির ভাবমূর্তি প্রকাশে থিয়েটার বা সংস্কৃতিচর্চা একটা উপাদান বটে; কিন্তু তার জন্য রাজকোষ থেকে টাকা খরচ করাটা আবার মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমাদের রাষ্ট্রের সঙ্গে কেমন মিল! তাই না? গত পঞ্চান্ন বছরে আমাদের রাষ্ট্রের দিকে তাকালে আমরা এই বিষয়টিই দেখতে পাই। বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবশালী নেতারা এদেশে এলে, এদেশ যে শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে কতটা সমৃদ্ধ তা প্রমাণ করার জন্য তাদের সামনে দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হয়। অথচ সেই সংস্কৃতির জন্যই রাষ্ট্রের বাজেট থাকে সবচেয়ে কম। বিজনবিহারীরা নিজেদের খ্যাতির জন্য গিরিশবাবুদের সম্মান রক্ষার কথা ভাবলেও, মনে মনে চান থিয়েটারটা না হোক। এ হলো আমাদের দেশের সংস্কৃতিচর্চা বা থিয়েটারচর্চার প্রকৃত অবস্থা। ৩৪ বছর পর এ-নাটকটি আমার সামনে এই কনটেক্সকেই বড় করে তুলে ধরেছে। আর থিয়েটারের অন্তর্কোন্দল তো আছেই।  দর্পণে শরৎশশী নাটকের কাহিনি সহজ-সরল হলেও এর চলন বেশ আকর্ষণীয়। নাটকের প্লট, সংলাপ ও গাঁথুনিতে রয়েছে অনিন্দ্য সৌন্দর্য। এ-সৌন্দর্য একান্ত এ-নাটকের অন্তরাঙ্গের। আর সেটা প্রকাশের মাধ্যম অভিনয়। নাজনীন হাসান চুমকি, আশরাফুল আশীষ, ফিরোজ আলম প্রামাণিক, কামাল আহমেদ, ব্রততি বিথু, তৌহিদ মিটুল, মাসুম রেজা, শাহেদ নাজির হেডিস – এঁরা ভালো অভিনয় করলেও অনেকের অভিনয়ে অন্তরের স্পর্শ কম ছিল। অভিনয়ে অন্তরের স্পর্শ কথাটা অনেকের কাছে মনে হতে পারে, সেটা আবার কী? অভিনেতা ভালো চরিত্রায়ন করেন, সুন্দর করে সংলাপ বলেন, দেখতে-শুনতে ভালোই লাগে, তবে কোথাও যেন একটা খামতি থেকে যায়, মনে হয় শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে পারছেন না চরিত্রকে। চরিত্রের অন্তরটা যেন অধরাই রয়ে যায়। মনে হয়, অভিনেতার হৃদয়, চরিত্রের হৃদয় স্পর্শ করতে পারছে না। সবার ক্ষেত্রে নয়,…

  • মোহাম্মদ কিবরিয়ার একক প্রদর্শনী -নীরবে নিবিড়ে আধুনিকতার ধ্যান

    মোহাম্মদ কিবরিয়ার একক প্রদর্শনী -নীরবে নিবিড়ে আধুনিকতার ধ্যান

    এ-বছরের প্রথম দিনটি ছিল শিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ কিবরিয়ার ৯৭তম জন্মদিন। গুণী ও খ্যাতনামা এই শিল্পীর জন্মদিনে রাজধানীর লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে তাঁর নির্বাচিত ৮৪টি অপ্রদর্শিত মৌলিক শিল্পকর্ম (১৯৮০-২০০৬) নিয়ে প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল গত ১লা জানুয়ারি। এটি শেষ হয় জানুয়ারির ২৬ তারিখ। প্রদর্শনীটি দেখে মনে হয়েছে, এ শুধু চিত্রকর্মের সমারোহ নয়; এই কাজগুলোয় একজন পরিণত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদগ্ধ শিল্পীর একপ্রকার নীরব আত্মসংলাপ অনুভব করা যায়। ১৯৮০ থেকে ২০০৬ সময়পর্বের ৮৪টি কাজ নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনী মূলত শিল্পীর শিল্পকৃতি প্রকাশের চেয়ে মনে হয়েছে আগামীর জন্য তাঁর সঞ্চয়। যেগুলো তিনি রেখে দিয়েছিলেন অন্য কোনো পরিকল্পনার প্রস্তুতি হিসেবে। তাঁর চলে যাওয়ার দুই দশক পর পরিবারের আগ্রহ ও ইচ্ছায় এই আয়োজন। মোহাম্মদ কিবরিয়ার জীবনের পটভূমি এই পাঠের জন্য অপরিহার্য। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁকে অনিচ্ছাকৃত অভিবাসীতে পরিণত করেছিল। ১৯২৯ সালের ১লা জানুয়ারি তাঁর জন্ম পশ্চিম বাংলার বীরভূম জেলার সুরি গ্রামে। ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে স্নাতক সমমানের শিক্ষা সমাপ্ত করে একাকী ঢাকায় আসেন। এই বাস্তুচ্যুতি তাঁর শিল্পে কখনো সরাসরি বিষয় হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে আছে ভাঙা ফর্ম, স্তরবিন্যাস, নীরবতা ও অসম্পূর্ণতার ভাষায়। প্রাথমিক কিউবিস্ট পর্বে সেই ভাঙন ছিল দৃশ্যমান ও কাঠামোগত; জাপানে উচ্চশিক্ষার পর তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভাষাহীন, ধ্যানী বিমূর্ততায়। এই প্রদর্শনীর চিত্রকর্মের ছাব্বিশ বছরের সময়পর্বটির অনেক আগে থেকেই কিবরিয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে নানা সম্মাননাপ্রাপ্তিতে যেমন অগ্রসর, সুপ্রতিষ্ঠিত, তেমনই দেশের প্রধান বোদ্ধা এক চিত্রকর। পারিবারিক সংগ্রহে থাকা স্বাক্ষরবিহীন যেসব কাজ, অসম্পূর্ণ কোলাজ কিংবা কলমে অংকনকৃত নারীদেহের অনুকৃতি দেখা গেছে, এগুলো হয়তো শিল্পীর বড় আকৃতির চিত্রপটে আঁকার সুবিধার্থে করা শিল্পীর খসড়া কাজ। কিবরিয়ার এসব খসড়া কাজের মধ্যে ১৯৮৩ সালে কামরুল হাসান কৃত কালি ও কলমে আঁকা এক নারী-অবয়বও ছিল। শিল্পীপুত্র নারশিদ কিবরিয়ার লেখায় জানা গেল, তাঁর পিতা বাড়ির অলিন্দ্যে বসে চা পান করতে করতে পাশেই রাখা নানা রঙের কাগজ, অন্য শিল্পীর প্রদর্শনীর ক্যাটালগ, কাটার, কাঁচি, ম্যাগাজিন, কলম, পেনসিল, আঠা এসব ব্যবহার করে কোলাজ তৈরি করতেন। নারশিদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি – তাঁর পিতা কিবরিয়া কাগজে অনুভূতিপ্রবণ পরিবেশ ও মুড তৈরি করে একটু একটু করে কাজ অগ্রসর করতেন। এক্ষেত্রে চিত্র গঠনের চেয়ে তাঁর অন্তর্গত অনুভূতির প্রকাশটিই গুরুত্বপূর্ণ। মাধ্যমগতভাবে প্রদর্শনীতে রয়েছে ৬০টির বেশি কোলাজ, ১৫ থেকে ১৮টি মিশ্র মাধ্যম ড্রয়িং ও ইংক ওয়ার্ক, সীমিত কিছু ছাপাই বা এচিং এবং শেষ পর্যায়ে অয়েল প্যাস্টেল ও কাগজে তেলরঙের কাজ। সবই কাগজে, এই ছোট পরিসর ও মাধ্যম ইংগিত করে – এগুলো ঠিক গ্যালারির চার দেয়ালে শোভা বৃদ্ধির জন্য আঁকা বা তৈরি নয়; এগুলো স্টুডিওর ভেতরে চিন্তার পরিসর সৃষ্টির জন্যই শিল্পীর প্রয়াস ছিল। সমগ্র কিবরিয়ার সৃষ্টিশীলতার অদেখা রূপটি এবার দর্শক-বোদ্ধারা দেখতে পেলেন এ-প্রদর্শনীর হাত ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে বিশ্ব-শিল্পের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন হয়েছিল, যে আধুনিক ধ্যান শিল্পকে নতুন ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে, এর পরিশীলিত ছাপ এই প্রদর্শনীর কাজগুলোর পটভূমিতে। গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে নিউইয়র্ক স্কুলের শিল্পীরা রংকে আবহে রূপ দেওয়ার যে-ভাষা তৈরি করেছিলেন, তার প্রতিধ্বনি কিবরিয়ার বড় ক্যানভাসে ধ্বনিত হলেও ছোট আকৃতির খসড়া কাজগুলোয় সেই নাটকীয়তা নেই। ইউরোপীয় আধুনিকতায় স্থানিক ও সময়ের চিহ্ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিবরিয়ার কাজে ওদের রুক্ষতা নেই, তাঁর চিত্রপট সংযত ও নমিত শিল্পীর স্বভাবের অনুরূপ। কাজের উপস্থাপন ও প্রবণতায় তাঁর সঙ্গে পল ক্লি, মার্ক রথকোর আত্মীয়তা প্রত্যক্ষ করা গেলেও এই প্রদর্শনী দেখিয়ে দেয় যে, কিবরিয়া তাঁদের মনের ভেতরে নিয়েছেন, গ্রহণ করেছেন, তবে তা রূপান্তর করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে উচ্চতর শিল্পশিক্ষা গ্রহণে কিবরিয়ার জাপানগমন। সেখানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পের গতিপ্রকৃতি প্রত্যক্ষ করেন এবং নিজ চিত্রকলার এতকালের ধ্যানকে বদলে ফেলার প্রেরণা পেয়ে যান। এবার প্রদর্শিত কাজগুলোর কতকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। ১৯৮০ সালে আঁকা তেরোটি চিত্র ও কোলাজচিত্র এই প্রদর্শনীতে দেখা গেল। যেমন চিত্র-১, ২, ৩, ৪, ৬, ২৬ এবং ২৮ থেকে ৩৪ সংখ্যক। চিত্র-১-এর ওপরে ও নিচে গাঢ় নীল রঙের আলোছায়ার মাঝে ডট, রেখার কারিকুরিসহ প্রায় ফাঁকা জায়গাটুকু যেন পুরো চিত্র গঠনের ভার বহন করে শ্বাস ফেলার জন্য রাখা।…

  • চিত্রকরদের বরেন্দ্র ভ্রমণ ও প্রদর্শনী

    চিত্রকরদের বরেন্দ্র ভ্রমণ ও প্রদর্শনী

    ঢাকার শিল্পীদের নতুন বছর শুরু হয়েছে পুরনো গ্লানি, অসহিষ্ণু সময়কে পেছনে ফেলে নতুন কতক সম্ভাবনার পথযাত্রার মধ্য দিয়ে। নগরজীবনের নানা টানাপড়েন ও সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে বহুদূরের বরেন্দ্রভূমিতে গ্রামীণ জনপদের আবহে কয়েকটা দিন অবসরযাপন ও ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা এবং তাঁদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সখ্য উপভোগ করেছেন একদল চিত্রশিল্পী। এই ভ্রমণ-আনন্দ যেন ফুটে উঠেছে শিল্পীদের সৃজনে গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল সুখী-সুন্দর ছবিগুলোয়! সম্প্রতি ধানমন্ডির সড়ক ৪, বাড়ি ২১-এর তিনতলায় অবস্থিত গ্যালারি চিত্রকে হয়ে গেছে বাংলার বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় দলবদ্ধ সেই শিল্পভ্রমণে অঙ্কিত চিত্রমালার প্রদর্শনী। এর শিরোনাম ছিল ‘পরম্পরার খোঁজে বরেন্দ্র ভ্রমণ’। শিল্পীদলটি যাঁকে ঘিরে বা কেন্দ্রে রেখে বরেন্দ্র ভ্রমণ করলেন, তিনি ওই এলাকার বরপুত্র দেশে-বিদেশে সুপরিচিত বরেণ্য চিত্রকর রফিকুন নবী (১৯৪৩), আমাদের কৃতী শিক্ষক, স্বাভাবিক অবসরের পর এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক। ছবি আঁকা, আড্ডা আর ভ্রমণে তাঁর আগ্রহ আর উদ্দীপনায় তিনি যেন তিরাশি বছরের এক সতেজ তরুণ! এ-প্রদর্শনী দেখে ও ভ্রমণ আয়োজন এবং ওই কয়দিনের গালগল্প শুনে আমরা তেমনটাই অনুভব করতে পারছি। এই শিল্পভ্রমণে রফিকুন নবীর সঙ্গী ছিলেন মাহফুজুর রহমান (১৯৫৮), আহমেদ সামসুদ্দোহা (১৯৫৯), শেখ আফজাল (১৯৬০), নিসার হোসেন (১৯৬১), শিশির ভট্টাচার্য্য (১৯৬০), মনিরুজ্জামান (১৯৬২) ও শামসুল আলম ইন্নান (১৯৬৬)। আরো ছিলেন রফিকুন নবীর অনুজ রেজাউন নবী (১৯৫৮)। তাঁরা বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পী এবং মাহফুজুর রহমান বাদে অন্যরা শিক্ষক রফিকুন নবীর সরাসরি ছাত্র। ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় আবুল বারক আলভীর (১৯৪৬) যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে প্রদর্শনীর জন্য তিনিও এঁকেছেন। আমরাও তাঁর কাছ থেকে নানা সময়ে ওই শেকড়ের গল্প শুনেছি। তাঁর আঁকা ছবিতেও আমরা বারবার দেখতে পেয়েছি বরেন্দ্রভূমির নানা ছবি। মহানন্দার পাড় ঘেঁষে ফসল বোঝাই গরুর গাড়ির ছবি, নাচোলের কৃষকদের শক্ত চোয়াল, মহানন্দা পাড়ের খেয়াঘাট, গৌড় স্থাপত্য, নদী পারাপার, ওখানে বসবাসকারী সাঁওতালপল্লী, তাদের নানা ছবি, বরেন্দ্র অঞ্চলের মহিষ ও ছাগল – এসব যেন শিল্পীর রংতুলিতে বাক্সময় হয়ে উঠেছে। প্রদর্শনীর ব্রোশিওরে ‘শেকড় সান্নিধ্য’ শিরোনামে  লেখক-শিল্পী মাহফুজুর রহমান যে-লেখাটি লিখেছেন তাতে তিনি শিল্পী রফিকুন নবীর শৈশব গঠনে পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা নদীর ত্রিসঙ্গম, নতুন পলিমাটি, মরুভূমির মতো পদ্মার বিস্তৃত বালুচর, তীরবর্তী পিত্রালয় ছত্রজিৎপুর ও মাতুলালয় ঢেড়াবোনা গ্রামের প্রকৃতির ভূমিকাকে গুরুত্বসহকারে চিত্রিত করেছেন। তিনি আরো লিখেছেন – আমরা যে রফিকুন নবীকে চিনি তিনি প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষক, লক্ষ-কোটি ভক্তের কাছে টোকাইয়ের স্রষ্টা, কৃতী চিত্রকর, স্বাদু রচনার সুলেখক। ছত্রজিৎপুরের বাস্তুভিটা এখন নেই। ঢেড়াবোনা থেকে নানা-নানি নতুন বসতি গড়েন শিবগঞ্জ উপজেলার গোবরাতলা গ্রামে। পরে এখানেই গড়ে ওঠে রফিকুন নবীদের বর্তমান গ্রামীণ পারিবারিক পটভূমি। এ-শতাব্দীর শুরুতে সেখানে স্বল্পপরিসরের একটি আমবাগানের সঙ্গে লাল ইটের একতলা বাড়ি ধরে রেখেছে এগারোটি পৃথক পরিবারের পরম্পরা।…

  • আমাদের সর্বজয়ী মস্তিষ্ক ও চেতনার স্বরূপ

    আমাদের সর্বজয়ী মস্তিষ্ক ও চেতনার স্বরূপ

    প্রায় দেড় কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা লক্ষ করল যে, তাদের জীবনধারণের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে – গাছপালা ও বনজঙ্গলের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। শিম্পাঞ্জি, গরিলা, গিবন, ওরাংওটান ইত্যাদি প্রাণী তাতে কষ্ট করে হলেও টিকে রইল; কিন্তু আমরা আমাদের ‘স্বর্গোদ্যান’ থেকে অভিশপ্ত হয়ে রূঢ় পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই বাধ্য হলাম জঙ্গলের রাজত্ব ত্যাগ করে সাভানাচারী হয়ে খোলা ময়দানে আসতে। এর ফলে আমাদের দেহকাঠামোতেও দেখা দিলো পরিবর্তন – আমরা আরো সোজা হয়ে হাঁটতে ও দ্রুত দৌড়াতে সমর্থ হলাম, হাতদুটো শরীরের ভারমুক্ত হয়ে শিকার ও অন্যান্য কাজের উপযুক্ত হলো, আর একসময়ে আমরা হলাম ‘হাতিয়ারধারী প্রাণী’ – মানুষ। বেশি ছোটাছুটি করার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে হ্রাস করার উপায় হিসেবেই সম্ভবত আমরা আমাদের গাত্রলোম হারালাম, কারণ প্রাইমেটকুলে ১৯৩টি প্রজাতির মধ্যে সব এখনো দেহলোমাবৃত থাকলেও একমাত্র আমরাই হচ্ছি নগ্ন – অর্থাৎ গাত্রলোমহীন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যদিও ফলমূল ও মৃত জীবজন্তুর মাংস খেয়েই জীবনধারণ করত, কিন্তু নতুন পরিবেশ আমাদের বাধ্য করল অপেক্ষাকৃত নিরীহ জীবজন্তু শিকার ও হিংস্র জীবজন্তুকে তাড়ানোর উপায় অবলম্বনে ‘দলবদ্ধ শিকারি’ (co-operative pack Hunter)-এর জীবন বেছে নিতে।  আমরা ছিলাম প্রকৃতির অপেক্ষাকৃত দুর্বল, খুবই সাধারণ মানের একটি নিরীহ প্রজাতি। আমাদের দাঁত-মুখ-নখ ইত্যাদির কিছুই ভয়ংকর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপযোগী না হওয়ায় আমরা হাতে তুলে নিলাম চারদিকে ছড়ানো ভোঁতা পাথর, যা দিয়েই আমরা যৌথ কৌম জীবনের শক্তিতে হিংস্র জীবজন্তুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে আমরা শিখলাম পাথরের অস্ত্রকে সুঁচালো ও তীক্ষ্ণধার করার পদ্ধতি, আয়ত্ত করলাম তাকে লাঠির আগায় বেঁধে লম্বা বর্শার মতো মারাত্মক অস্ত্র বানিয়ে দূর থেকে জন্তু-জানোয়ার ঘায়েল করার বুদ্ধি। আমাদের শিকারি পূর্বপুরুষদের দল প্রধানত পুরুষ শিকারিদের নিয়ে গঠিত ছিল বলে তাদের নারীরা সন্তান প্রতিপালন এবং অন্যান্য কাজের ফাঁকে একসময় আবিষ্কার করে কৃষিপদ্ধতি। এর ওপর ভিত্তি করেই আমরা একসময় আমাদের পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল যাযাবর জীবন ত্যাগ করে বেছে নিলাম স্থায়ী জীবন। এরপর আমাদের সমাজজীবনে এত দ্রুত পরিবর্তন আসে যে, মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেও যে হাত চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালাত, সে-হাত মহাকাশে রকেট পাঠানোর সলতেয় আগুন জ্বেলে দেওয়ার শক্তি অর্জন করেছে। আমরা হলাম Homo sapiens বা জ্ঞানী মানব। আমাদের এই অগ্রযাত্রায় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে যে-অঙ্গটি, তা হচ্ছে আমাদের দেড় কেজি ওজনের শক্তিকেন্দ্র বা Power House বলে পরিচিত মস্তিষ্ক। আমাদের এই অঙ্গটি আমাদের হৃদপিণ্ডের মতোই রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা বিশ্রামহীনভাবে আমাদের সচল রাখতে কাজ করে, যা তার মাঝে সঞ্চিত রাখে বিলিয়ন বিলিয়ন তথ্য – আমাদের স্মৃতি, অভ্যাস, সহজাত প্রবৃত্তি, দক্ষতা, আশা, নিরাশা, ভয় ইত্যাদি সবকিছুই। আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো তাদের বিশাল সংযোগ-সূত্র (neural connections) দিয়ে সঞ্চিত করে রাখতে সক্ষম অর্ধশতাব্দী আগে শোনা কোনো অজানা শব্দ, সেতারের তারে ঠিক নির্দিষ্ট পরিমাণ টোকা দেওয়ার ক্ষমতা, দাবা খেলার কয়েক হাজার চাল, কোনো প্রিয়জনের ঠোঁটের নির্দিষ্ট পরিমাণ হাসির বক্রতা, দিগন্তরেখায় পাহাড়ের উপস্থিতি, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের আলাদা মুখচ্ছবি, বিভিন্ন ফুলের গন্ধের বিভিন্নতা, বাল্যকালে স্কুলে পড়া নামতা কিংবা কবিতার পঙ্ক্তিমালা, দীর্ঘদিন আগে শোনা নরকের শাস্তি বা স্বর্গের মধুর দৃশ্য বর্ণনা কিংবা সুদূর অতীতে মাথা উঁচু করে দেখা রাতের তারাভরা আকাশের ছবি –…

  • কাল

    কাল

    সতেরো  হারিকেনের চিমনিতে চুলের মতো সরু একটা ফাটল। খেয়াল করে না তাকালে চোখে পড়ে না। চিমনির গলার কাছে কালি জমেছে। সেই কালি সাফ করতে গিয়ে ত্যানার ঘষা মাত্র লাগাতে যাবে দোলন, তখনই ফাটলের দাগটা চোখে পড়ল। সাবধানে না করলে এই ফাটল বড় হবে। চিমনি দু’ফালা হয়ে যাবে। যে কোনো ফাটলের এই নিয়ম। চাপ পড়লে বড় হয়। দোলন সাবধানী হাতে হারিকেনের চিমনি সাফ করতে করতে কমলরানীর দিকে তাকাল। মনের কূটকচালির লেশমাত্র নেই কণ্ঠস্বরে, বরং সহানুভূতির ছোঁয়া আছে। কমলরানীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সব কথাই তো আমাকে তুমি বললে। শুনে মনে হলো তোমার হিসাবে গণ্ডগোল আছে। মামাকে তুমি বুঝতে পারোনি।’ কমলরানী বসে আছে দোলনের খাটে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে পিছদুয়ার দিয়ে কমলরানীকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকেছিল দোলন। ঘরের অন্ধকার গাঢ় হতে চলেছে। কথা শুরুর আগে তাই হারিকেন জ্বালতে গিয়েছিল সে। দেশলাইটা রাখা ছিল টেবিলে রাখা হারিকেনটির পাশে। ন্যাকড়ায় চিমনি ঘষার ফাঁকে কথা শুরু করেই দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালল। কাঁটা ঘুরিয়ে হারিকেনের সলতে খানিকটা উঁচোয় তুলে কাঠি জ্বালল। কেরোসিন ভরাই ছিল। দপ্ করে জ্বলে উঠল হারিকেন। হারিকেনের মাথার ওপরকার আংটা টেনে চিমনি বসিয়ে দিলো নিপুণ হাতে। ঘরের ভেতরকার অন্ধকার কেটে গেল।  কেঁদে কেঁদে কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে গেছে কমলরানীর। ছোট্ট খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল সে। বলল, ‘তোমার কথা আমি বুঝতে পারি নাই দোলন। তোমার মামার ব্যাপারে আমার কিয়ের গণ্ডগোল?’ হারিকেন টেবিলের ওপর রেখে কমলরানীর মুখোমুখি দাঁড়াল দোলন। ‘মামার বয়সের হিসাব আছে তোমার কাছে? আমার তো মনে হয় না। বয়সে সে তোমার বাবার সমানও হতে পারে, বড়ও হতে পারে। ছোট হবে না। এই বয়সের একজন মানুষ তোমার স্বামী। তার কাছে তুমি কি আশা করো। প্রথম কয়েকদিন তোমার মতে সে ঠিকঠাক ছিল, কিছুদিন ধরে ঠিক নাই। চারদিন-পাঁচদিন পর একবার সে তোমাকে কাছে টানে। এটাই স্বাভাবিক। সে তো আর কুঁড়ি-পঁচিশ বছরের জোয়ানমর্দ মানুষ না যে, প্রতিদিনই তোমাকে কাছে টানবে। এখন চার-পাঁচদিনে একবার টানে, এরপর সপ্তাহ পনেরো দিনেও একবার টানবে না। তারপর মাসেও একবার না। একসময় দেখবে তুমি আগুনে পুড়ছো আর মামা আছে জল হয়ে। এটাই বয়সের নিয়ম।’ একটানা কথাগুলো বলে মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলল দোলন। ‘এসব কথার কোনোটাই ঠিক নয়। আমার দেবু ঠাকুর অতিমানব। তাঁর শরীর অল্পবয়সী যুবকদের চেয়েও তেজি। প্রতিরাতেই নারীদেহের উত্তাপ তাঁর প্রয়োজন। তাঁর উত্তাপ মেটাতে লাগে দোলনের মতো নারী। কমলরানীকে দিয়ে তা হবে না। এই নারী নিশ্চয় ঠাকুরের শরীরের তালে তাল মেলাতে পারছে না। তার কামশক্তি ক্ষীণ।’ কমলরানী বলল, ‘আমারও যে তারে রোজ রাইতেই লাগবো আমি তেমন আদেখলা মাইয়া না। তয় মাত্র বিয়া হইছে। পয়লা পয়লা চাহিদা কিছুটা থাকবোই। দিনে দিনে আমারও সেই চাহিদা কইমা আইবো।’ ‘আমি তা বুঝি। ওসব তুমি ঠিকই বলেছো। এখন তোমাকে আমি অন্য একটা প্রশ্ন করি। এই বয়সী একজন মানুষের কাছে তোমার বাবা-মা কেমন করে তোমার বিয়ে দিলেন? তোমার বয়সী মেয়ের বাপের বয়সী মানুষের সঙ্গে বিয়ে হয়? মামার কাছ থেকে জীবনে তুমি কি পাবে, তা তোমার বাপ-মা কেন ভাবলেন না?’ কমলরানী আবার ফুসফুস করে কাঁদতে লাগল। জড়ানো স্বরে বলল, ‘বিয়ার বয়স পার হইয়া যায়, পাত্র পাওয়া যায় না। দেশ-গেরামে সিয়ানা মাইয়ার কত পদের বিপদ। পার্টিশানের আগে হিন্দু মাইয়াগো এত বিপদ আছিল না। যারা আমগো ভয়ে কাঁপতো, চোখ তুইলা বাড়ির বউ-ঝিদের দিকে তাকাইতো না, এখন তাগো ভয়ে আমরা কাঁপি। কোনসুম টাইনা লইয়া যায় পানের বরজের ভিতরে। দিন-দোফরে দলবাইন্ধা ধর্ষণ করে। সেই ভয়ে ঘর থিকা বাইর হইতাম না। মা-বাপে কী করবো? ঠাকুরের মতো পাত্র পাইছে, বয়েস বেশি তাতে কী, মাইয়া পার করতে পারলেই বাঁচে।’ দোলন বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। ‘তা অবশ্য ঠিক। এই যখন অবস্থা, তখন আর কান্নাকাটি করে লাভ কী? অবস্থা মেনে নিয়েই চলতে হবে। মন খারাপ না করে, কান্নাকাটি না করে যেভাবে চলছো, সেইভাবেই চলো। মামাকে বুঝতে দিও না কিছু।’ কমলরানী তখন আকুল হয়ে কাঁদছে। ‘কত স্বপ্ন আছিল আমার। বিয়ার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাচ্ছা আসবো পেটে। বাচ্ছা হইয়া যাওয়ার পর তারে লইয়া ব্যস্ত থাকুম। স্বামীর আদর-সোহাগ তখন না পাইলেই বা কী? আমার মনে হয় সেই কপাল হইবো না। এই বয়সী মানুষ কি বাপ হইতে পারবো?’ দোলনের মনে তখন বিপুল আনন্দ। মনের বনে উতল হাওয়ার তোলপাড়। ‘ঠাকুরকে তুমি চেনো না, বসুবাড়ির মেয়ে। চাইলেই সে তোমাকে মাতৃত্বের স্বাদ দিতে পারে। তা সে দেবে না। তুমি তাকে চেনোনি, আমি চিনেছি। এই জগতের ভেতরে থেকেও তাঁর বিচরণ অন্য জগতে। এতবড় বাড়িতে একা পড়ে থাকে। কেউ চোখ তুলেও তাকায় না তাঁর দিকে। ভয়ে। আতঙ্কে। আমিও তো এক যুবতীকন্যা। দেখতে আকর্ষণীয়া। এই গ্রামেও জোয়ানমর্দ মুসলমান পুরুষের অভাব নেই। কই তারা তো আমার দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাবার সাহস পায় না। কেন? দেবু ঠাকুরের ক্ষমতাবলে। তাঁর ক্ষমতার কোনো তল পাবে না তুমি। তবে তোমার কথায় আমি আজ বুঝেছি, আমার কারণে বিয়ে সে তোমাকে করেছে ঠিকই, কিন্তু তোমাকে তাঁর পছন্দ হয়নি। তাঁর পছন্দ আমি। আমি তাঁকে যা দিতে পারি, তুমি তা পারো না। তাঁর শরীর নিভে আসছে এই কারণে। দিনে দিনে এমন হবে, ঠাকুরের স্ত্রী হয়ে তুমি ঠিকই থাকবে, সেসব বাইরে বাইরে। ভেতরে তোমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সে ফিরবে আমার কাছে। আজ আমার চোখের সামনে ঠাকুরকে নিয়ে ঘরে খিল তোলো তুমি, সেই খিল আমি আবার তুলবো। হয়তো তোমার চোখের সামনেই তুলবো।’ মনের এইসব কথা কমলরানীকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলো না দোলন। মানুষটির অসহায় কান্না দেখে এমন ভঙ্গিতে তার কাছে এগিয়ে গেল, যেন সে খুবই সহানুভূতিশীল। যেন কমলরানীর কষ্টে তারও বুক ফেটে যাচ্ছে।  এগিয়ে গিয়ে কমলরানীর দু’কাঁধে দু’হাত রাখল দোলন। অন্তরে বিষ,…

  • পিতৃত্ব

    পিতৃত্ব

    অনুবাদ : আলম খোরশেদ  তৃতীয় কিস্তি স্টকহোমে একবার এক পার্টিতে গিয়েছিলাম আমি, সেখানে একজন বক্সার উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিচেনে বসেছিলেন, তার শারীরিক উপস্থিতি দেখার মতো ছিল, এবং তিনি আমাকে এক সুনিশ্চিত কিন্তু নিরানন্দ হীনম্মন্যতাবোধে ভরিয়ে তুলছিলেন। এমন একটা অনুভূতি যে, আমি তার চাইতে অধমর্ণ। অদ্ভুতভাবে সেই সন্ধ্যাটা আমি যে সঠিক, সেটাই প্রমাণ করেছিল। পার্টির আহ্বায়ক ছিল লিন্দার এক বন্ধু, কোরা, তার ফ্ল্যাটটা ছোট ছিল, ফলে লোকেরা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। লিভিংরুমে একটা যন্ত্র থেকে গান ভেসে আসছিল। বাইরে রাস্তাগুলো তুষারে সাদা হয়ে আছে। লিন্দা খুব ভারিক্কিরকম অন্তঃসত্ত্বা, সেটাই সম্ভবত বাচ্চা হওয়ার আগে আমাদের শেষ কোনো পার্টি ছিল, বাচ্চা হওয়ার পর সব পালটে গিয়েছিল, তাই সে ক্লান্ত থাকলেও সেখানে যেতে ও কিছুক্ষণ সময় কাটাতে চেষ্টা করেছিল। আমি একটু ওয়াইন খেয়ে টমাসের সঙ্গে গল্প করছিলাম, যে ছিল আলোকচিত্রী ও গাইয়েরের বন্ধু; সে তার পার্টনার ম্যারির মাধ্যমে কোরাকে চিনত, যে কি না একজন কবি এবং বিশপস আর্নো ফোক স্কুলে কোরার শিক্ষক ছিল। লিন্দার ভারি পেটের জন্য সে টেবিল থেকে ছুটিয়ে আনা একটা চেয়ারে বসে ছিল, সে হাসছিল ও খুশি দেখাচ্ছিল তাকে, এবং আমিই বোধহয় একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম, যে লক্ষ করেছে গত কয়েকমাসে তার মধ্যে এক চাপা দীপ্তি ও অন্তর্মুখিতার ছোঁয়া লেগেছে। কিছুক্ষণ পরে সে উঠে দাঁড়ায় ও বাইরে যায়, আমি তার দিকে চেয়ে হাসি এবং আমার মনোযোগ ফেরাই টমাসের দিকে, সে লালচুলো লোকদের জিন বিষয়ে কিছু একটা বলছিল, যাদের সংখ্যা সেই সন্ধ্যায় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ একজন দরজা ধাক্কাচ্ছিল। ‘কোরা!’ আমি শুনি। ‘কোরা!’ সেটা কি লিন্দা ছিল? আমি উঠি এবং হলরুমের দিকে যাই। দরজা ধাক্কানোর শব্দটা বাথরুমের ভেতর থেকে আসছিল। ‘লিন্দা?’ আমি জিজ্ঞেস করি। ‘হ্যাঁ,’ সে বলে। ‘আমার মনে হয় দরজার তালাটা আটকে গেছে। তুমি কি কোরাকে ডাকতে পারো? এটা খোলার নিশ্চয়ই কোনো কৌশল রয়েছে।’ আমি লিভিংরুমে গিয়ে কোরার কাঁধে টোকা দিই। সে এক হাতে একটা খাবারভর্তি প্লেট ও অন্য হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস ধরে রেখেছিল। ‘লিন্দা বাথরুমে আটকে গেছে,’ আমি বলি। ‘হায় হায়!’ সে বলে, তারপর গ্লাস ও প্লেটখানি নামিয়ে রেখে দৌড়ে যায়। তারা কিছুক্ষণ আটকে যাওয়া দরজার মধ্য দিয়ে আলাপ-পরামর্শ করে। তাকে যে-নির্দেশগুলো দেওয়া হয় লিন্দা তা অনুসরণ করে, তবে তাতে কোনো কাজ হয় না, দরজাটা আটকেই থাকে। এতক্ষণে ফ্ল্যাটের সবাই এ-পরিস্থিতি বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে, তাদের মনোভাব একাধারে হাসির ও উত্তেজনার, পুরো এক বাহিনী লোক হলরুমে থেকে লিন্দাকে উপদেশ দেয়, আর কোরা উদ্বিগ্ন ও বিব্রতভাবে বলতে থাকে যে, লিন্দা ভীষণরকম অন্তঃসত্ত্বা, আমাদের এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একজন তালার মিস্ত্রিকে ফোন করার। আমরা যখন তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লিন্দার সঙ্গে কথা বলি, বিব্রতকরভাবে সচেতন যে, সবাই আমার কথা শুনতে পাচ্ছে এবং আমার অসহায়তাকে অনুভব করছে। আমি কি স্রেফ লাথি মেরে দরজাটা ভেঙে তাকে বের করে আনতে পারি না? সহজ ও কার্যকর সমাধান?…

  • ফ্রাঞ্জ ফানো : বিপ্লবী প্রতিবুদ্ধিজীবী

    ফ্রাঞ্জ ফানো : বিপ্লবী প্রতিবুদ্ধিজীবী

    উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একজন বিপ্লবী প্রতিবুদ্ধিজীবী হলেন ফ্রাঞ্জ ফানো (জন্ম : ২০শে জুলাই, ১৯২৫, মৃত্যু : ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৬১)। তিনি ছিলেন একজন সাহসী মানুষ, চিন্তাশীল ও জ্ঞানশীল লেখক, চিকিৎসক ও বিপ্লবী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি জীবিতকালের চেয়েও মৃত্যুর পর দিন দিন জনপ্রিয় হয়েছেন এবং এখনো তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এই গবেষণার ধারা অব্যাহত আছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইমানুয়েল হানসেন (১৯৩৭) বলেন, ‘O f all black writers and intellectuals he is perhaps the most written about. In Algeria places have been named after him, and in the United States and Italy research centers have been erected in his memory. He has taken his…

  • আধুনিকতার দিকে স্বদেশের যাত্রায় – চলচ্চিত্রজন হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন

    আধুনিকতার দিকে স্বদেশের যাত্রায় – চলচ্চিত্রজন হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন

    শুরুর কথা হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন চলচ্চিত্রজন। কিন্তু এই পরিচয়টি যেন যথেষ্ট নয় – যেন একই সঙ্গে আরেকটি কথা তাঁদের সম্পর্কে লিখে ফেলতে হয় যে, তাঁরা আধুনিক মানুষ। লিখে ফেলার পর একরকমের কৈফিয়ত তলবের ব্যাপার তৈরি হয় নিজের মধ্যেই যে – কী এই পরিচিতির সূত্র, কীভাবে এর নির্মাণ? বিশেষ করে, এইসব দেশে, যারা উপনিবেশোত্তর, তাদের জন্য আধুনিকতার প্রসঙ্গটি বড় গোলমেলে। তাদের বিকাশ, অর্থনীতি, রাজনীতি বা সংস্কৃতি কীসে হয় আধুনিক? কোথায় তারা আলাদা উন্নত পৃথিবীর বা উপনিবেশকদের আধুনিকতা থেকে? অথবা আরো এগিয়ে, আধুনিকতা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক এই তৃতীয় দুনিয়ার মানুষ আর তাদের সমাজে, রাষ্ট্রে? – এসব তর্ক আমাদের মধ্যে বেড়ে ওঠে। তারা ভ্রান্তি, বিভ্রান্তি এবং নানারকম প্যারাডক্সের জন্ম দেয়। কিন্তু আধুনিকতাকে ঘিরে চর্চাটি থামে না, সেটা জারি থাকে।      আমাদের জন্য এরকম একটি বিবেচনাই যথেষ্ট যে, আধুনিকতা কিছু বিশেষ ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তিগত অবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে ঐতিহ্য এবং সনাতন পন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, যৌক্তিকতায় বিশ্বাস স্থাপন, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের দিকে যাত্রা, শিল্পায়ন, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠন, নগরায়ণ, জাতি-রাষ্ট্রের সৃষ্টি – এসব কিছুকে আধুনিকতার চিহ্ন হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এই আধুনিকতার যাত্রা শুরু ষোড়শ শতাব্দী থেকে – ইউরোপে। তারপর তাদের উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়ায় আধুনিকতার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ও বিস্তার উপনিবেশসমূহে। তবে বলে রাখা ভালো, পশ্চিমের দেশ নয় এবং উপনিবেশায়ন ঘটেনি এমন দেশেও আধুনিকতা বিস্তৃত হয়েছে। যেমন জাপান ও রাশিয়া। উপনিবেশসমূহ নানাভাবে আধুনিকতার ধারণাটিকে আত্মস্থ ও মোকাবিলা করেছে। বি-উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়ায় সেখানে আধুনিকতার নতুন নতুন সংস্করণের আবির্ভাব ঘটেছে। রাষ্ট্রগঠনের নায়কেরা নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, সমাজ সংস্কারক এবং সংস্কৃতির কারিগরেরা নিজস্ব ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সমন্বয়ে আধুনিকতার এক স্থানীয় এবং সমকালীন রূপ নির্মাণ করেছেন। কোথাও কোথাও তারা পরিচিতি পেয়েছে প্রাসঙ্গিক আধুনিকতা বা কনটেক্সচুয়াল মডার্নিটি নামে। আমাদের আলোচ্য দুজন মানুষ – হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন এমনি এক উপনিবেশোত্তর সময়ের এবং রাষ্ট্রের নাগরিক। এই ভৌগোলিক অঞ্চলে গত শতকের চল্লিশের দশকের শেষে উপনিবেশের হাতবদলের প্রক্রিয়ায় একটি নতুন যাত্রা শুরু হয় রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে। এই সময়কালের সামগ্রিক প্রবাহ তাঁদের হয়ে ওঠাকে এবং তাঁদের কর্মতৎপরতাকে প্রভাবিত করেছে; করে তাঁদের আধুনিকতার কারিগরে পরিণত করেছে – এই আমাদের প্রস্তাব। এদেশে আধুনিকতার যাত্রা পাকিস্তান সৃষ্টি পূর্ববঙ্গে বি-উপনিবেশায়ন ঘটায়নি; রাষ্ট্রযন্ত্রও আধুনিক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার পরিধিরেখায় অবস্থিত রাষ্ট্র হিসেবে তার এক ধরনের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন শুরু হয়েছিল; পণ্যপ্রধান অর্থনীতির স্বাদ এই জনপদের মানুষ পেতে শুরু করেছিল। এই আধুনিকায়ন পশ্চিমের প্রযুক্তি এবং তজ্জনিত পণ্যের ব্যবহারকারীতে পরিণত করেছিল এখানকার মানুষকে, তার ভেতর শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ভাষা-আন্দোলন এখানকার সাংস্কৃতিক আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল সেই ১৯৪৮-এ। ১৯৫২-তে তার পরিণতি। তবে ইতিহাসের যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে লিখে রাখা ভালো যে, বিশ শতকের বিশ এবং ত্রিশের দশকেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ঢাকাতে। ভাষা-আন্দোলনকে তারই যৌক্তিক প্রসারণ হিসেবে ভাবা যেতে পারে।  ভাষা-আন্দোলনের সূত্র ধরে মানুষ সচেতন হয়েছিল স্থানীয় কৃষ্টির বিষয়ে। আর নব্য লভিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা,…

  • আদি-অন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূত-ভবিষ্যৎ

    আদি-অন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূত-ভবিষ্যৎ

    বাঙালি কে? এই প্রশ্নটি যদি আজ করা হয় তাহলে অনেকেই হয়তো হেসে উঠবেন। কিন্তু প্রশ্নটি কি নিতান্তই অবান্তর? আমজনতা বলবেন : যিনি বাংলায় কথা বলেন, যাঁর মাতৃভাষা বাংলা তিনিই – তো বাঙালি। তখনই হয়তো প্রশ্ন উঠবে, শিক্ষিত বাঙালি সমাজের অনেকেই আজ এ-ভাষায় দক্ষতা অর্জনে কি গৌরব বোধ করবেন, স্বস্তিবোধ করছেন? আজ থেকে কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে ব্যবহারের/ প্রয়োগের নির্দেশ জারি করে এর অন্যথায় শাস্তির বিধান রাখা হলেও আজ বোধ হয় রাষ্ট্রই সে-ব্যাপারে সবচেয়ে দ্বিধান্বিত। বিশেষত সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে, শিক্ষাদীক্ষায়-সংস্কৃতিতে অনগ্রসর একটি নব্য ধনিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের সন্তানদের ইংরেজি-পটু করার এক উদগ্র বাসনা গত দশকে ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাঁরা ভাবছেন, বাংলা ব্রাত্যজনের ভাষা। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানেও বর্তমানে বাংলা প্রায় পরিত্যাজ্য। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা-প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি কিছু কিছু কলেজের কথাও বলা চলে (ইংরেজি-মাধ্যম ব্যয়বহুল স্কুলগুলোর কথা বাদই দিলাম) যেখানে বাংলার প্রবেশাধিকারই নেই। অতিসম্প্রতি শ্রেণিকক্ষে বাংলা বলায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন প্রভাষকের চাকরি যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দুঃখের বিষয়, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের উচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের ভাষা ইংরেজি; ফলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা যখন রায় হাতে পান, তখন তাঁরা বুঝতে পারেন না সেখানে কী লেখা রয়েছে। অনেক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও বিদগ্ধ আইনজীবী মতপ্রকাশ করেছেন, উচ্চ আদালতের ভাষা অবিলম্বে বাংলা করা প্রয়োজন, জনগণের স্বার্থে। তাঁরা এও অভিযোগ করেছেন, ইংরেজিতে লেখা বিচারিক রায়ের ভাষা অনেক সময় ভুলে কণ্টকাকীর্ণ থাকে, অধুনা বিচারকদের ইংরেজি-জ্ঞানের অভাবের কারণে। এই অবস্থা যে কেবল বাংলাদেশে বিরাজ করছে তা নয়। বাংলা-ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গেও বাংলা ব্রাত্যজনের ভাষায় পরিণত হচ্ছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সেখানে হিন্দির উৎপাত বেড়েছিল, কিন্তু হিন্দির আক্রমণ বাংলার অগ্রগতি ও বিকাশকে রুদ্ধ বা ব্যাহত করতে পারেনি। মনস্বী ব্যক্তিরা সে-সময় তাঁদের মনীষার, মননের স্বাক্ষর বাংলায় রাখতে দ্বিধা করেননি। রচিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্য, উপন্যাস ও ছোটগল্প। কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গে ইংরেজি কেবল শিক্ষাদীক্ষারই মাধ্যম নয়, উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের জীবনচর্চার বাহনও হয়ে উঠেছে। এর একটা বড় কারণ বিশ্বায়নের ফলে ইংরেজির সর্বভারতীয়-ভাষা হয়ে ওঠা। বিশ্বজুড়ে বৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশন বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আজ তাদের বহুবিধ পণ্যের বিপণন ও  প্রচার-প্রসারের সঙ্গে তার বাহন হিসেবে ইংরেজিকেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব ভারতের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে প্রকট হচ্ছে, কারণ বহুজাতিক সংস্থাগুলো দেশটিকে তাদের পণ্যপ্রবাহ ও বিপণনের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একইসঙ্গে তাদের সহকারী হিসেবে কিছু ভারতীয় বহুজাতিক কোম্পানি বা সংস্থাও গড়ে উঠেছে। এরাও নিজেদের পুঁজি ও পণ্যের বাহন করেছে স্বাভাবিকভাবে ইংরেজিকেই। এরই ক্রমপ্রসারমান ফল ও প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্মেরও এক পরম কাক্সিক্ষত বা আরাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠেছে  ইংরেজি-জানা এবং ইংরেজি-বলা, যা জীবন-ক্ষেত্রে এগোনোর পাথেয় হিসেবেও দেখা দিয়েছে। এই প্রজন্মের কাছে বাংলা মুখের ভাষা হলেও, মাতৃভাষা হলেও, তা-কে তারা জীবনের সঙ্গী করতে পারছে না, সেভাবে ভাবছেও না। মৌখিক ইংরেজি চর্চার ফলে একটা কৃত্রিম বা পরজীবী আবহ ধীরে ধীরে তাদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বাংলা ভাষা জীবনের চর্চার ক্ষেত্র থেকে বিচ্যুত হওয়ায় এ-ভাষায় যে-বিরাট ও মহৎ-সৃষ্টিসমূহ রয়েছে তার সঙ্গে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অধুনা আমার বেশ কয়েকজন আত্মীয়ের ছেলেমেয়ে যারা স্কুল-কলেজ-জীবনে কৃতী ছাত্রছাত্রীর গৌরব অর্জন করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর অথবা অন্য কোনো মহৎ বাঙালি লেখকের লেখা তারা পড়েনি; এমনকি, পড়ার কোনো আগ্রহও তাদের নেই। মৌল ইংরেজি নয়, মৌখিক ইংরেজিরই চর্চা করে এরা। তাই কথ্য ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করলেও ইংরেজি বা বিশ্বের অন্যান্য ভাষার মহৎ লেখকদের রচনার সঙ্গে তাদের পরিচিতি নেই বললেই চলে। ফল হচ্ছে এই, জীবনের গভীর উপলব্ধির ক্ষেত্রটা তাদের কাছে প্রান্তবর্তী থেকে যাচ্ছে। প্রায় একই আলেখ্য আমরা নব্বই-পরবর্তী বাংলাদেশেও দেখতে পাচ্ছি। এখানে এর ভিত্তিটা আরো কিছুটা স্থূল, তা আগেই উল্লেখ করেছি। এখানে পরভৃত ইংরেজি-সংস্কৃতির বাহক হলো নব্য ধনজীবীরা; তাঁদের অনেকে ধন অর্জন করেছেন অনেকটা লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে। এঁদের ধনের বড় একটা অংশ হলো আত্মসাৎকৃত ব্যাংক-ঋণ, অসৎ ব্যবসাও এঁদের ধনের উৎস, যেমন, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং,…