October 2004

  • দুনিয়ায় একটি দুপুর

    আমি গ্রিক বলি আর তুমি বলো ল্যাটিন ল্যাটিনতা নিয়েই বাসে উঠি, বাস ওঠে আমার ওপর মিল দিতে আসে যন্ত্রবাঘ, তার গর্র ঘর্ঘরজাকির খান আসেন, তবলা বাজে ধিন তা তা ধিন রোদে ও ছায়ায় বলে একদিন এক কবিতা ছিলএ রকম দুইভাগে, তাতেই আহ্লাদ একদিন হয়েছিল তাতে হাসি পায়, হাসি পায় না, দাড়িগাঙ দিকচিহ্নহীনছুটে চলে তার সঙ্গে…

  • অবিরাম ঝরে পড়ো

    অবিরাম, অবিরাম মনে পড়ে।অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারার মতো তুমিঝরে পড়ো নিবিড় আকাশে!আজ স্বপ্নের মতো মনে হয় তোকে!আমের শাখার মুকুলিত সোঁদা গন্ধ মেখেমাতাল হাওয়ায় ভেসে ভেসে একদিনএসেছো হৃদয়, মনে পড়ে?হয়তো পড়ে না মনে।তোমার মনে কি পড়েআমাদের তীরভাঙা ছোট ছোট ঢেউ!হয়তো সে ভুল স্রোতধারা –ফিরে গেছো বালুচর ছেড়ে!অবিস্মরণ, অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারার মতো তুমিঅবিরাম ঝরে পড়ো অদৃশ্য তিমিরে।

  • সঙ্গজালে ঘেরা খাঁচা

    অর্ধচোখ বুজে বসে আছে, ওকে দেখি।গোটানো শরীর জুড়ে মৌনীভাবসুষ্ঠু অভিনয়। নিঃশব্দ চলনে ঢোকে ঘরে, অন্তর্তদন্ত সেরেচলে যায়, অভিজাত হাঁটা।জিভে আঁচড়ে নেয়া শাদা রোমকপালে বাদামি জয়টিকা। ও জানে ও পুরুষবেড়াল।ওর একাকিত্ব আর নির্ভয় ব্যক্তিতাসশব্দ যুদ্ধের আগে মহড়া, প্রস্তুতিদেখে বোঝা যায়অনিবার্য জননেতা, সমস্ত লক্ষণওর মধ্যে বর্তমানকোনও সমকক্ষ ওর প্রয়োজন নেই। মানুষই একমাত্র শুধু একাকিত্ব ভীরুঅনর্থক সঙ্গজালে ঘেরা…

  • বিব্রত সংলাপ

    তুমি বারবার নতুন কিছু শুনতে চাইলেবোল্লে : ‘আমাকে নতুন কিছু শোনাও’আমি বোল্লাম : ‘অমাবস্যার পুঞ্জপুঞ্জ অন্ধকারএকদল কালো মুখোশ-পরাডাকাতের মতোশিকার করতে চাইছে শাদা খরগোশের মতো কম্পমানচাঁদটাকে’তুমি বোল্লে : ‘এর কোনো অর্থ নেই!’ আমি আবার বোল্লাম : ‘তুমি কী শোনোনিতিনটে মাছের আক্রমণে নিহত মাছরাঙা প’ড়ে আছে নদীরওপারে’তোমার চোখের তারাঅবিশ্বাসে বারবার নেচে উঠলো : ‘এটা একটাপ্রকৃতি-বিরুদ্ধ ঘটনা, হ’তেই…

  • নিবেদন

    কয়েকবছর আগে কোলকাতা থেকে কয়েকজন লেখক, প্রকাশক ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। উনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন তখন ওঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। জেনেছিলাম, বাংলা সাহিত্যের খবরাখবর উনি ভালো রাখেন।সেবার আমাদের ঢাকায় যাওয়ার একটিই উদ্দেশ্য ছিল। কোলকাতায় আমাদের নতুন বই বের হতেই তিনদিনের মধ্যে সেগুলোর পাইরেট এডিশন ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম সেগুলোতে…

  • খাঁচারটিয়া

    অনুবাদ : জাফর আলম [ভারতে ইংরেজি উপন্যাসরচনার পথিকৃৎ মুল্ক রাজ আনন্দ্ ৯৯ বছর বয়সে মুম্বাইতে মৃত্যুবরণ করলেন গত ২৮ সেপ্টেম্বরে। তাঁর জন্ম হয় ১৯০৫ সালে, পেশোয়ারে। শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয় পাঞ্জাব, কেমব্রিজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুকাল জেনেভার লিগ অফ নেশনস ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার পর তিনি নানাধরনের কাজ করেন ভারতে ও ইংল্যান্ডে। ১৯৪৬ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসে…

  • অদৃশ্যজগতেরসন্ধানে

    আকাশের দিকে তাকানোর ব্যাপারটি আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। নগর-জীবনে ‘আকাশ’ শব্দটি ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। অল্পজায়গায় অনেক মানুষকে জায়গা দেওয়ার জন্যে উঁচু উঁচু বিল্ডিং মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সেগুলো ধীরে ধীরে আকাশকে আড়াল করে দিচ্ছে। তারপরও কেউ যদি আকাশের দিকে তাকায় দেখবে সেটি সৌন্দর্যহীন বিবর্ণ। শহরের ধুলোবালিতে ধূসর। রাতের বেলা সেই আকাশ আমাদের চোখে পড়ে…

  • বিউটিকনটেস্ট

    সম্ভবত সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী আফ্রোদিতিই ইতিহাসের প্রথম ব্রহ্মাণ্ড-সুন্দরী যাকে নির্বাচন করে ট্রয়-রাজকুমার প্যারিস এত বড় একটা যুদ্ধের ভিত্তি রচনা করে ফেলেছিলেন। দেবীরা সেকালে অমর হলেও তাদের সৌন্দর্য-বিচার করবার ভার নশ্বর মানুষের বা আরো সঠিক বলতে চাইলে পুরুষের হাতেই ন্যস্ত হয়েছিল, যে-কানুন আজও পরিবর্তিত হয়নি। আজকের বিশ্বসুন্দরী বা ব্রহ্মাণ্ড-সুন্দরীরা কালে মিডিয়ার এক একজন দেবী বা…

  • সময়েরচিৎকার : মান্দেল্শ্তাম্

    আমরা তো বেঁঁচে, দেশ আছে কিনা অনুভবে বোঝা ভার;আমাদের কথা দশ পা গেলেই শোনা যায় না ক’ আর। আলাপচারিতা যেখানেই চলে আদ্ধেক কথাতেইক্রেমলিনে চড়ে-বসা পাহাড়ীর কথা উঠে আসবেই। কর-অঙ্গুলি ইয়া মোটা মোটা, কৃমি যেন, মেদে ভরা;যে-কথাই কয় নিখাদ সত্য দাঁড়িতে ওজন-করা। তেলাচোরা যেন দু’টি শুঁড় তার হাসি-হাসি মুখে চায়,ঘাড়-তোলা বুট ঝকমক করে সর্বদা চমকায়।তার চারিপাশ…

  • গদ্যশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলী

    বিংশ শতাব্দীর পঞ্চম দশকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে সৈয়দ মুজতবা আলীর (১৯০৪-১৯৭৪) আবির্ভাব অনেকটা আকসি¥কভাবেই। দেশে-বিদেশে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মুজতবা আলী পাঠকচিত্ত জয় করলেন এবং শেষদিন পর্যন্ত তাঁর খ্যাতি ছিল অম্লান।আন্তর্জাতিক চেতনায় সমৃদ্ধ এই লেখকের বিশ্বমানবিকতা এবং অননুকরণীয় অনন্য শৈলীতে তাঁর স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে মজলিশি বা আড্ডা-রসের একটি ধারার ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু খোশগল্প তাঁর রচনায়…

  • শোধ

    মোহরআলি তখনো ভূতগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখের সামনে প্রায় মরো মরো জলাশয়। তাতে কচুরিপানার দঙ্গল কালো মেঘের মতো জমাট বেঁধে ছিল। ফলে জল আছে কী নেই, বোঝা মুশকিল।অথচ খানিক আগে এই আছে কী নেই জলে ইফু খলবল তুলেছে! মোহরআলির দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে পাতালি বরাবর হেঁটে গেছে। মোহরআলি বাধা দেবার ফুরসত পায়নি। আর বাধা দিলেই…

  • ভাষারসীমা-সীমান্ত

    হাঁটার কথাও উঠল, ভাষার কথাও উঠল। ভাষার গতি কেমন – হাঁটা, না ওড়া, না চক্কর-মারা? আমি এখানে ভাষা বলতে শুধুই মুখের কথা ধরছি। জন্ম থেকেই শুনে আসছি – ক্রোশেষু জঙ্গমতে ভাষা। সব ভাষাই কি ক্রোশে-ক্রোশে বদলায়? সংস্কৃত প্রবাদটিকে একটু ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করা যায়, ক্রোশে-ক্রোশে বদলালেই কি ভাষা? অন্তত সংস্কৃত, আরবি, ল্যাটিন – এগুলো আইন-কানুন দিয়ে এত টাইট যে ক্রোশান্তর তো দূরের কথা, দেশান্তরেও বদলায় না। আর-একটা কথাও তো সেই প্রায় জন্ম থেকেই শুনে আসছি – নদীর বাঁক যত, কথা তত। ওই একই মানে – বাঁকে-বাঁকে কথা বদলে-বদলে যায়। গ্রামের নানারকমের মানুষের সঙ্গে প্রথম মেলামেশার ভিতর থেকে প্রায় তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছর আগে আমার মনে হয়েছিল, চাষির ভাষা হাঁটে না, পাক খায়। ওই ধানভানার সময় যেমন ধান ছড়িয়ে গরু ঘোরানো হয় পাক খাইয়ে, তেমন। রোজ একই পথ বা আল ধরে একই জমিতে চাষ করতে যাওয়া, সপ্তাহে দু-বার একবার একই হাটে খরচা করতে যাওয়া, কাছের ও দূরের গাছ-গাছালি নদীনালা চিনে যাওয়া – এটা তো একটা পাক। এমন কী এ-ও দেখেছি, সে যে-হাটে যায়, প্রায় তার সমদূরত্বের আরেকটা হাটের হদিশটাই জানে না। আরো একবার, আমি একটা নদী খুঁজছিলাম – নদী পেরিয়ে-পেরিয়ে, নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে-হেঁটে, ওই ‘বড় বাঁক’ নামের নদী খুঁজছিলাম। এক আমিই আনাড়ি, আর-সকলেই কব্রেজ। কত নদীর কত-যে নাম শুনলাম, আমার নদী আর আসে না। যে যতটুকু নদী জানে, শুধু সেটুকুই জানে। শেষে আমি রেগে গিয়ে বললাম, ‘আরে, আমার নদী না পেলে চলবে কী করে? নদী পেলে তবে তো ‘বড় বাঁক’ পেরিয়ে গোঁসাইনীর হাটে উঠব!’ শুনে সকলে মিলে সে কী হাসি! ‘রো রো রো, সেই কথাখান আগত্ কহিবেন তো? যাচ্ছেন হাটত্, গোঁসাইনীর হাটত্, আর খুঁজিবার ধইচছেন নদী! কী নদী? না? বড় বাঁক। নদীত্ কি হাট বসে? চলো কেনে – হাটও পাবেন,…