কবিতা

  • এই নগরে

    এ নগর থেকে একদিন বেরিয়ে যাবো আমি এখানে কেটেছে কত দীর্ঘ কালবেলা আর কত গ্রহণের কাল করবো পার এই ভণ্ডামি নষ্টামির শহরে! আর কত … বহুদিন পর আজ ভিজেছে নগর দূরের পথ অবধি! এমন বৃষ্টি এই ভাদরে! জল ঝাঁপিয়ে পড়ছে পাতার কোলে লাফিয়ে নামছে ফোঁটায় ফোঁটায় এতকিছু – তবু বৃষ্টিশেষে কেন নেমে আসে মৃত্যুর স্তব্ধতা…

  • কলকাতা

    গল্পগুলো রেখে দিই। স্মৃতিঘেরা মেঘলা দিনের জন্য। আজ মেঘলা মেঘলা দিন। একটু পরেই শুরু হবে বৃষ্টি। আমি নিউ গড়িয়ার হোটেল রুমের জানালায় রাখি চোখ। সামনে দিঘির জলের কাঁপন। কবি সুভাষ স্টেশন থেকে ছেড়ে যাচ্ছে পাতাল রেলের কন্যা। আমি তার হাত ছুঁয়ে দেবো বলে তড়িঘড়ি প্ল্যাটফর্ম।  দমদম নয়। যাবো কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজের বারান্দায়। সেইখানে বনগাঁর…

  • রূপকল্প : ২০২৩

    পাতাপাখিপুষ্প মন : সবুজ বার্তা নিয়ে উড়ে যায় দিগন্তের পানে … ঢেউ ওঠে অন্তরঙ্গ যুগল নদীতে; কী এক দারুণ রূপকল্প তৈরি হয়! নিজস্ব পৃথিবী সৃষ্টির খেলায় আবারো মত্ত হয় কুশলী স্রষ্টা; সৃষ্টিসূত্রে মহাপৃথিবীর গান বেজে ওঠে জলদূষণের শিকার যতসব নদী আছে ওরা স্বাদুজলে স্নান সেরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বভ্রমণে … মৎস্যকন্যারা সমুদ্রতীরে এসে সিক্ত শরীরে লাগায়…

  • অন্ধকারের হাত

    কাছে ডাকে চেনা মুখ অন্ধকারের হাত বুকের ভূগোল শস্য সবুজ ঘর-গেরস্থালি; আগুনে পুড়ে নৈঃশব্দ্যের গোপন লাল রাত সময় নির্বাসিত চোখের সীমানা যতদূর ভ্রমণে কালবেলা; সাথিহারা যেমন অন্ধ বুকের বোতাম খোলা দূর অন্ধকারে সুধা ঢেলে রাত …

  • চুম্বন ও শস্যদানা

    (উৎসর্গ : অকালপ্রয়াত এক বন্ধুর উদ্দেশে) টিএসসি সড়কদ্বীপ থেকে কথারা উড়ত হাওয়ায় আর আমাদের বৈকালিক ক্লাসে নানান খণ্ডদৃশ্য মুহুর্মুহু নেমে আসত বহুতর ধ্বনিসঙ্গে আমরা দেখতাম, বৃষ্টি নামছে শস্যদানার মতো ওদের কুড়িয়ে নিয়ে শূন্য পকেট ভ’রে আমরা ফিরতাম যে যার বাড়ি। তুই বলতিস, কবিতার জন্য কিছু অপেক্ষা লাগে যেমন ফসলের জন্য আমরা অপেক্ষা করি বৃষ্টির বলতিস, অপেক্ষা…

  • অনুসন্ধান

    বাড়ি দেখলেই সুখী সংসারের কথা কল্পনা করো না ওটা হয়তো কপাল পোড়া কোনো ঘর, এককালে – সুখী মানুষের বাসস্থান ছিল! বাসস্থান মানেই কি সংসার? উদ্বাস্তুদেরও বাসস্থান থাকে, গৃহে থাকে তৈজসপত্রের খুনসুটি। সংসারে থাকতে হয় ব্যক্তিগত কেউ একজন যে আঙুলের ডগায় ঝরে পড়া চুল পাকিয়ে পাকিয়ে আবদার নিয়ে বলবেন : তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু …

  • আলোবসন্ত

    আঁধারের অন্তর দেখতে গিয়ে দেখি – জোনাকি বন্দর আলোর বসন্ত বিনামূল্যে ফেরি করে বৃক্ষের সবুজ ফ্ল্যাটে কেঁপে উঠলো জলভরা যমজ চোখের নীল নক্ষত্র তবুও তাঁবু গেড়েছি গৃহ থেকে দূরে অসীম দিগন্ত উঠোনে, দেখে যাও বেদনা কাঠের ঘর – বড্ড বাদামি ঘুমন্ত পৃথিবী; মহুয়ার মগ্নতায় মনমমি হেঁটে যাচ্ছে কুয়াশাভেজা পথে। কার কাছে জমা আছে চেনা পায়ের…

  • আধফোটা গন্ধম

    তোমার নামে সন্ধ্যা নামে তোমায় ডাকে বিল লক্ষ কোটি শাপলা ফোটে তারারা ঝিলমিল। তোমার নামে মান্তি দিয়ে যাই পাহাড়পুর বৌদ্ধ ভিক্ষুর হৃদমাজারে তোমার সুরাসুর। তুমি আমার শীতের রাতের নকশিকাঁথার ওম হৃদকমলে জড়িয়ে রাখি আধফোটা গন্ধম। তোমার নামে সন্ধ্যা নামে বাড়ে গাঙের জল তুমি আমার কোমলগান্ধার চোখ দুটো ছলছল। তোমায় যদি হারিয়ে ফেলি সন্ধ্যা নদীর জলে…

  • একাত্তরের বৃষ্টিদিন

    কিছু বৃষ্টিদিন আমি ভুলে যেতেই পারি এই যেমন ভুলে গেছি বৃষ্টিদিন একাত্তরের। ঝুম বৃষ্টির দুপুরে এসেছিল ছেলেগুলি, শক্ত চিবুক, ঠিক মেঘের গর্জনের মতো; রাইফেল উঁচিয়ে ভেজা আকাশের দিকে তাকিয়ে ওরা বলেছিল, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’। ভাতের হাঁড়িতে বুদ-বুদ শব্দে ফেনা জমে ওঠে গরম ভাতের গন্ধে ছেলেরা সমস্বরে শপথ নেয়, খেতে পাক সাত কোটি বাঙালি, স্বাধীন…

  • বুনোজল

    ডিমভরা মাছগুলো সরীসৃপ খালে করে খেলা – অথচ পড়েনি জাল, জেলেহীন জলকেলি বেলা। বাঘের থাবার ভয়ে ভীরুপায়ে মধুবউ ঘোরে মধুবন – মন তার বেহুলার ভেলা যেন পতির ব্যথায় টনটন। স্বামী তার সোনামুগ,  শিমফুল, মাঠ ভরা পউষ ফসল – মৌসুমে কাছে আসে, জানে না বারমাসি – ব্যথা টলমল। গভীর সমুদ্রে নাও, বোঝে না সরিষার হলুদ লগন…

  • মোহাম্মদ রফিকের কবিতা

    আত্মজৈবনিক তুমি-আমি যোগ-বিয়োগের ফলাফল একটি দাঙ্গা, তোমাকে করেছে ভিনদেশি – আর আমি পরবাসী নিজ দেশে; তুমি-আমি শূন্যের কোঠায় শ্বাস নিই একটি যুদ্ধ বেশুমার স্মৃতিবহ স্বাধীনতা ফিরে আসা দগ্ধগৃহে : দেশ-দেশান্তরে বিভাজন রেখা টেনে দিলে তুমি আজ কালের গহ্বরে অমলিন আমি ধুঁকে মরি আত্মধিক্কারে লজ্জায়; তুমি আজ বিস্মৃতির সহচর বিস্তারিত নীলিমায় সন্ধ্যামণি ফুল, আর আমি অর্ধমৃত…

  • পদ্ম

    ডুবিল আসমানের তারা চান্দে না যায় দেখা। সোনালী চান্নির রহিত আবে পড়ল ঢাকা॥                       – মৈমনসিংহ গীতিকা সখী, সখী আমার মরিবে সে, মরিবে নিশ্চয় জানি; জানি না কোন ঘোরে যে উঠিল এমন তুমুল ঝড় চাঁদ-তারা ডুবিল ঘন মেঘের ভিতর, ভাঙিল ঘর আর ছাড়িল শখের সংসার সন্তান আর বন্ধু ছিল যত।                        এখন নিঃসঙ্গ পথে পথে…