November 2004

  • মোয়া

    পুজোর মাসে নদীতে এল জোয়ার কিন্তু আমি চিরটাকাল গোঁয়ার, এত গোঁয়ার, এত গোঁয়ার ক্যানেল কেটে রাখার কথা মনে এলেও আনিনি মনে একেকদিন শুধু – বাঁকের মুখে ইচ্ছে হতো ছোঁওয়ার। ঠিক তখনই এ গ্রাম থেকে ও গ্রাম যাওয়া কৃষাণ-কৃষাণীরা আওয়াজ দিল, সময় নেই, সময় নেই সময় নেই বাবুগো ধান রোওয়ার। আর আমি গলা অবধি ঘামে চুপসে…

  • নীলকণ্ঠ

    লতার বন্ধন বড় মারাত্মক, বুঝেছি সংসারে। হায় লতা, হায় সর্প, আমৃত্যু জড়ালে বাসযোগে কিংবা খেলনা লাটিম ঘোরাঘুরি বিরহী আবর্তে, সমাজ চক্ররেখায় বিনীত বিদ্রোহী সর্বক্ষণ। কভু মনে হয় এযে অস্তগামীহীন পূর্ণচাঁদ নিত্যনৈমিত্তিকতা আড়ের কান্নাজাগানিয়া রৌরব। ইত্যাকার বৃত্তবন্দি অশ্রুময় নৌকাভ্রমণের ডাক শুনি বারংবার অসমাপ্ত নিসর্গ ভাষায়। কিন্তু সব একাকার। মেঘপূর্ণ এই হৃদয়ের বেদনার ভার বড় মর্মন্তুদ, প্রবল…

  • ডায়েরি থেকে

    যারা পথে বেরিয়ে পড়েছে তাদেরকে জনে জনে প্রশ্ন করি – তোমরা আমার ছোটো ভাইটিকে দেখেছ কি। আমার কুকুর-ছানাটাই বা গেল কোন দিকে, বলো দেখি। আরো নানাবিধ প্রশ্ন করাতেই আমরা দক্ষতা ও কৌশল। যেমন, জানতে চাই – আজ কোন বার, কোন সাল, বাংলা না ইংরেজি, পুজোর কতটা দেরি। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় প্রশ্ন করি – কাল উপোস দিয়েছ। ক্ষতবহ…

  • রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডের ভার

    নিজের হৃৎপিণ্ড নিজেই কীভাবে ক্ষত-বিক্ষত করে দিতে হয় লোকটি এতোদিন পরে শিখেছে। এটিই ছিল তার সরল স্বীকারোক্তি। কাজটি সে জেনে না কি না-জেনে করেছিল, এখনো বুঝতে পারছে না। যদি সে জেনে করে থাকে, তবে অপরাধী কিনা; আর যদি না-জেনে তাহলে তাকে বেনিফিট অব ডাউট দেয়া যাবে কিনা। লোকটি কোনো উকিল দেয়নি, নিজেও নিজের পক্ষে-বিপক্ষে কোনো…

  • বরেন্দ্রর ভেদকথা!

    বাতাসে আমগন্ধ মদির। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়কে রাতভর ল্যাংড়ার ট্রাক। উত্তরসড়ক গুঞ্জনে মর্মরে গর্জনে সবাক। মধুভারে আক্রান্ত মৌমাছি। বরেন্দ্রর ভেদকথা কী জানে পামর! পুরাকণ্ঠ উজিয়ে আসে ফিস ফিস অস্ফুট কথা। কৃষ্ণা রাত। থাম থাম ঝুপসি ছায়ার আমগাছ। প্রেতিনীদের কলাম সারি সারি। আজ দায়মুক্তি সংসার থেকে। শাহ সুজার অশ্বখুরধ্বনি মিলিয়ে যায় ধূসর কানসাট বর্ডারে। কফিনের ঘের থেকে সত্যি…

  • মায়াবী বন্ধন

    সামনে যেতে-যেতে লোকটা বারবার কেন যে থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়, আমরা ভেবে মরি, কিন্তু আসমান-জমিন ভেবেচিন্তে কিচ্ছুই বুঝি না। ও কি কোনো দরকারি কাগজপত্র কিংবা ডাকে ফেলবার লেফাফা, কিংবা অন্য-কিছু – এই যেমন টিপিনের বাক্স, ছাতা, ঘড়ি, রুমাল, ডট-পেন, প্লাস-পাওয়ারের চশমাজোড়া, কিংবা ওইরকমই কোনো দরকারি জিনিস – ভুল করে বাড়িতে ফেলে পথে বেরিয়েছে…

  • তাকে

    জানতে কি, কতদিন   ভেবেছি আকুল হ’য়ে     তুমি না থাকলে       কি করে থাকব। আজ তুমি নেই কত কাল। তবু তো থেকেই গেছি। রোজ ভোরে উঠি, কাজ নেই, সারাদিন ছুটি,     খাওয়া দাওয়া, এটা ওটা দেখি, শুনি, দিন শেষ হলে শুতে যাওয়া।     আবার সকালে ওঠা। এ কেমন থাকা? প্রকৃতির মতো? তার তো ভাল…

  • নিবেদন

    বিয়ের পর ঝগড়া না করে দীর্ঘকাল দাম্পত্যজীবন কাটিয়েছেন এমন দম্পতির সংখ্যা একশতে কতজন? একজন সমীক্ষক, যিনি এ-বিষয়ে কাজ করেছেন, জানালেন, একেবারে কোনোদিনই ঝগড়া হয়নি এমন দম্পতি আছেন বলে জানা যায় না। একটু-আধটু মতান্তর সবারই হয়, দুটো মানুষ অবিকল এক নয়, তবে সেটা খুব তাড়াতাড়ি মিটেও গেছে এমন দম্পতির সংখ্যা দশ হাজারে একটি। দশ হাজার অনেক…

  • জাক দেরিদা – বিনির্মাণবাদকে হ্যাঁ বলুন

    চুয়াত্তর বছর বয়সে সম্প্রতি দেহরক্ষা করেছেন জাক দেরিদা, যাঁকে ইংল্যান্ডের একটি পত্রিকা, ডেইলি টেলিগ্রাফ, কুড়ি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে অভিহিত করেছে। বিখ্যাতরা মৃত্যুর পর অনেক বন্দনা লাভ করেন, তাতে অতিকথন থাকে। কিন্তু ডেইলি টেলিগ্রাফ সম্ভ্রান্ত পত্রিকা, তার লেখাগুলোতে অতিকথন থাকার কথা নয়। অথচ দেরিদাকে শ্রেষ্ঠ বললে লুডভিগ ভিটজেনস্টাইনের জায়গাটা কোথায় যায়? অথবা জাঁ পল সার্ত্রর?…

  • আবুল ফজলের সাহিত্যচিন্তা

    বিশ শতকের বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা, জ্ঞান-অন্বেষা ও ভাবুকতার সঙ্গে যেসব বাঙালি মনস্বী পুরুষের সমবায়ী উদ্যমের কথা স্মরণ করা যায়, আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) তাঁদের অন্যতম। শিক্ষা, সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি আবুল ফজল সমাজবিকাশের ক্ষেত্রে পালন করেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। আপন পশ্চাদ্পদ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এবং তাদের মুখপত্র শিখাগোষ্ঠীর (১৯২৭) সঙ্গে। ‘মুসলিম সাহিত্য…

  • হীরা বেগম

    আর সেবার বসন্তের মাঝামাঝিতেই সেই তীব্র গরমে আমের গুটিগুলো পুষ্ট হতে পারেনি তেমন। কতক ঝরে পড়েছিল কাজলা, বিনোদপুর, মেহেরচণ্ডি, শিরোইল আর বালিয়াপুকুরের ধুলোওড়া বালি-বালি মাটির উপরে, কতক গাছে গাছে ঝলসে গিয়েছিল। ঝলসে যাওয়া সেসব গুটি গাছের ডালেই দিব্যি কালো হয়ে কেমন বেগুনপোড়া রূপ নিয়ে লটকে ছিল। সে এমন গরম, সকাল বোঝা যেত না। কেউ কেউ…

  • জঙ্গলে কত কী ঘটে

    চাঁদের ঘোলা আলোয় চারপাশ ভিজে জবজবে হয়ে আছে। মাঝরাত পেরোনোর পর চাঁদ এমনিতেই হেলে যায়। তখন তার জ্যোৎস্না লম্বা লম্বা বড় গাছ ছুঁয়ে আরো লম্বাটে ছায়া হয়ে শুয়ে পড়ে মাটিতে। এখানকার মাটির রং লাল। কাছাকাছি যে-পাহাড় আছে, তা পেরোতে তেমন মেহনত করতে হয় না। প্রথম প্রথম অবশ্য কষ্ট হতো, পরে অভ্যাস হয়ে গেছে ধীরে ধীরে।…