January
-
সকলেই যায় … তুমিও
(প্রিয় মানুষ, শ্রদ্ধেয় হাসনাতভাই …) সকলেই যায় … তুমিও যাবে, ও-পথ কি এত প্রিয় প্রিয় সান্নিধ্যের টানে আকুবাকু করছিল মন ভেতরে ভেতরে তাই আকাশকে সাক্ষী রেখে ধণুর্ভঙ্গ পণ … আর সব থাক, তুমিও চললে পথে আর সব বট প্রাচীন পথের পাশে বটের দাওয়ায়? তুমিও হাজির হলে কেউ বুঝি ডেকেছিল এত তীব্র আহ্বান সত্তর ছুটে গেলে…
-
আবুল হাসনাত বাড়ি নেই
No day is safe from news of you – Sylvia plath. ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’ – পৃথিবীর এত আলোর নিচে হারানো পথের দীর্ঘ বিস্তার চোখে প্রত্ন মেঘের কুহক আপনি কোন হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে ব্যস্ত – মুখর শূন্যতার ছায়াশব্দের ভিড়ে, আপনার সেই আগানবাব দেউড়ি নিরুত্তর প্রিয় ৯২ যুগীনগর বলেছে, ‘হাসনাত বাড়ি নেই’ শুধু ধু…
-
আশ্চর্য সম্পাদক
হয়তো-বা দ্বিধা নিয়ে, খানিকটা সংশয় নিয়ে একসঙ্গে পাঠিয়েছি কয়েকটি কবিতা। বলেননি একবারও, কিছুই হয়নি, বলেননি কোনোদিনই, বিবেচনাধীন, বলেননি, জমে আছে বিস্তর কবিতা, দেখা হয়নি, দেখে উঠতে সময় লাগবে। আপনি সত্যিই এক আশ্চর্য সম্পাদক, সমীহজাগানো, স্নিগ্ধ উদারতা নিয়ে বারবার ছেপেছেন আমার কবিতা। পত্রিকার মূল্যবান সাদা পাতা ভরে গেছে তৃণতুচ্ছ কবিতায় ক্রমশই গাঢ়তর হয়েছে বিস্ময়। এত ভালোবাসা…
-
কবি-সম্পাদকের প্রয়াণে শোকপঙক্তি
(সম্পাদক আবুল হাসনাত ও কবি মাহমুদ আল জামান। একই বৃন্তে যুগল কুসুম) ধ্যানেজ্ঞানে কায়মনে আজীবন ছিলে তুমি নিঃসঙ্গ উদ্ভিদ ব্রতী ছিলে সম্পাদনে, একেলা নির্জন কবি তপস্যামগন, নিভৃতিপ্রিয়তা ছিল চিরসঙ্গী যেন শান্ত নিঃশব্দ ঘুঙুর হয়তো কোনো বহতা নদীর নাম, মর্মরিত দোলায়িত হাওয়ার বেহালাছড়ে বেজে উঠছে তোমার না-থাকা, আকস্মিক মৃত্যুর ছোবল এত ভয়াবহ কেন হয় কেন এই…
-
ভুবনডাঙায়
(প্রিয় অগ্রজ আবুল হাসনাত স্মরণে) এখনই ফিরে যাব? এত যে বৃষ্টির অবিরল ধারা আকাশ কী দুঃখ পেল শুধুই কি আলো জ্বেলে গেছি নিভন্ত কলমে? নরম মাটির টানে কুমোরের হাত চলে যেত কাব্যের শরীরে গনগনে অক্ষরের ছাঁচে গড়েছি প্রতিমা উত্তাল ঊনসত্তর, মিছিলের ঘর্মাক্ত মুখ যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর, কোথায় হারিয়ে গেছে বিসর্জন প্রথম অর্জন কোনো এক জীবনের!…
-
সেই বৃক্ষমহিম
(আবুল হাসনাত স্মরণে) জোছনার তবক জড়ানো একজন সৌম্য চলে গেলেন পশ্চিমে সেই বৃক্ষমহিম প্রকাণ্ড গুঁড়ি পাতা ভর্তি ডালপালা সরল পাখি পাখির সুস্থ বাসা বৃষ্টি না-হারানোর কথা ছিল গহিন শিকড়ে প্রদোষকালের ছেঁড়া ছেঁড়া আলো পড়ে আছে ধানক্ষেতের ঢালে বাংলা ফুলের বিজনলাগা মুখ যেখানে অজস্র অ মানে যোগ আ মানে বিয়োগ ক মানে গুণ খ মানে ভাগ…
-
যাই
(কবি-সম্পাদক আবুল হাসনাতকে নিবেদিত) যাই, চলো যাই, যাবার বিকল্প নাই, চলো, রূপে ও অরূপে যাই; চলো, যেতে যেতে নিত্য বিবর্তনে যাই; স্থিরচিত্র থেকে স্বরূপ-অরূপ চিত্তে নিত্য সমর্পণে যাই। বদলপ্রবণ পায়ে এতদূর আমরা এসেছি। বিবর্তিত শুদ্ধচিত্তে বারবার আমাকে পেয়েছি। ফলনপ্রবণ দেহ, নিত্যবৃত্তে নবায়িত মন যুগলে ভ্রমণরত, সর্ব অঙ্গে ডানাসন্তরণ, বাঁক পার হয়ে বারবার অন্য এক বাঁকে; অনন্তবদলরূপ জীবেদের ডাকে শুধু ডাকে। আকৃতিবদল যদি বোধের ধরন সিদ্ধকাম মুনিঋষি বা বৈয়াকরণ মুহূর্তের রথযাত্রী, অনিত্য গড়ন, মূর্ত আর বিমূর্তের বিবিধ বাস্তবে; নীড় ভেঙে নীড়ে যাই সৃষ্টি কলরবে। ভ্রমণ মরণ নয়, মরণ ভ্রমণ : জন্মমৃত্যু নির্ধারিত দুই ইস্টিশন; সুরতবদল করে নিত্য পরিযায়ী সটান দণ্ডায়মান কিংবা শয্যাশায়ী পঞ্চভূতে যাত্রা অহর্নিশ: প্রাণীরা আহার-ঘ্রাণ ভেষজ-আমিষ। তারপর একদিন শীতলপাটিতে যদি মাটিতে বিলীন, মানুষ বদলযাত্রী রূপে রূপে দিগন্তে আসীন।
-
আমার আবেগ
(আবুল হাসনাত স্মরণে) তুমি দেখেছিলে একা, জেনেছিলে কতকিছু জীবনের দ্বন্দ্ব থেকে পেয়ে গেছো জ্ঞান আর স্মৃতি মাঝে মাঝে সেইখানে নেচে গেছে স্মৃতির চড়ুই – জেনেছিলে এই সত্য – সময় চলেছে উড়ে ক্রূরচোখ ঈগলের মতো – রূপসীর রূপের জাদুও তার নখে ছিঁড়েখুঁড়ে যায়, মানবশরীরও বাঁচে না শুধু হৃদয় বাঁচে অন্যদের হৃদয়-গভীরে তোমার নশ্বর দেহ চলে…
-
আবুল হাসনাতের স্মৃতির উদ্দেশে
বাংলা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেছে কিন্তু বাঙালির মন পুরোপুরি দু-টুকরো হতে পারেনি। বাঙালির মনকেও ভেঙে দু-টুকরো করার জন্য আকাশে পতাকা তোলা হচ্ছে। ভয়াবহ সব ধর্মপতাকা। সেইসব অগণিত ভাঙনের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে যাঁরা হাহা করে বিদ্রূপের হাসি হেসেছেন আপনি ছিলেন তাঁদের একজন। আপনার পতাকার নাম ছিল কালি ও কলম। পতাকাটি চিরদিন উড়বে …
-
আকাশই শুধু
প্রত্যেক মানুষ গাঙচিল যদিও তা স্বীকার করে না। শেষ অব্দি তার কাজ শুধু উড়ে যাওয়া। অন্য মানুষেরা মাটি থেকে আবছা দ্যাখে তাকে। মানুষ ও নীল এক হয়ে যায়। গাঙচিল ও মানুষ এক হয়ে যায়। থাকে না আকাশ বলে কিছু আর। অথবা আকাশই শুধু থেকে যায়। মানুষ তো সম্পাদক – অনেক উপর থেকে দেখতে পায় গাছ…
-

কয়েকটি সাক্ষাতের স্মৃতি
হাসনাতভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় মস্কোয় ১৯৮৬ সালে। বোধ করি ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে – শীতের ঠান্ডা তখনো পুরোমাত্রায়। গণসাহিত্যের সম্পাদক হিসেবে তাঁর নামের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম, কিন্তু সরাসরি সাক্ষাৎ সেই প্রথম। মস্কোয় তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে এসেছেন সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম। তাঁরই বাসভবনে এক সন্ধ্যায় ডাক পড়ল। সেখানে এর আগেও বারকয়েক গিয়েছি। তিনি…
-

হাসনাতদা
বিশ্বব্যাপী অতিমারীর কারণে দীর্ঘকাল ধরে বাড়িতে বন্দি। এই অবসরে নিজের অসমাপ্ত কাজগুলো গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করছি। তারপর প্রায় মাস আষ্টেক বাদে হঠাৎ একটা জরুরি কাজে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় চলেছি ভাড়া-করা বাহনে। বহুদিন পরে বিস্তীর্ণ খোলা আকাশের নিচে। চারদিকে ঝলমলে রোদ্দুর, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত্রের পরে তাল-খেজুরের সারি, কিছুটা দূষণমুক্ত বলে আকাশের রং ঘন নীল – অনেকদিন…
