ছোট গল্প
-

ছায়াছন্ন
জীবনে একবারই দুপুরবেলা ঘুমে চোখ লেগে এসেছিল জামিলা বেগমের। সে-ঘটনা যে সারাজীবন বিষাক্ত দুঃস্বপ্ন হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরবে, কে জানতো! শরীরে যৌবন ঢুকি ঢুকি করছে সময়েও তার ঘুম পেত না। অথচ পিঠাপিঠি বড়বোন ভাত খেয়ে দুপুর উপুড় করে ঘুমে তলিয়ে যেত। জামিলা একা একাই তাদের বাড়ির সামনের বড় কাঁঠালগাছে ঝোলানো পিঁড়িতে বসে দুলতেন। মনে হতো,…
-

তিনি ও ভিখারি
চোখ থেকে চশমাটি নামিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন তিনি চশমার দিকে। তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে নরম কাপড়টি বের করে খুব যত্ন করে পরম মমতায় চশমার কাচ-দুটি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে থাকেন, তবে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে রাস্তার ওপাশের ফুটপাতে বসে থাকা ভিখারিটির দিকে। এবার তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ঠিক তাঁর নিজের নাকের চূড়ার ওপর। তিনি স্পষ্ট…
-

হরবোলা
ঘেউ ঘেউ ঘেউ … মিয়াঁও মিয়াঁও মিয়াঁও … কিঁউ কিঁউ কিঁউ কিচ্ কিচ্ চক্ এরকম ডাকাডাকির শব্দ। ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে বেশ কয়েকজন রোগী, রোগীর সঙ্গী। অপেক্ষমাণ। সকলের সঙ্গেই শিশু আছে। কিংবা সকল শিশুর সঙ্গেই তার বাবা-মা কিংবা অভিভাবক আছেন। ডাক্তার শিশু-বিশেষজ্ঞ। এখানে কোনো কুকুর, বিড়াল কিংবা অন্য কোনো পশুপাখির চিকিৎসা করা হয় না। আর…
-

শ্রাদ্ধ
দোকানের নাম ‘শিব্রাম চক্কোত্তির বইয়ের দোকান’। দোকানের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে প্রথমদিন শিব্রামবাবু ফিক করে হেসে ফেললেন। ভাবলেন, সাইনবোর্ড দেখে ক্রেতা তাঁর দোকানে ঢুকবে প্রফুল্লচিত্তে হাসিমুখে। কিন্তু তাঁর দোকানের নাম পড়ে তিনি ছাড়া আর কেউ কোনোদিন হাসলো না। বরং বিরক্ত হয়ে একজন জিজ্ঞেস করলো, এ কেমন নাম মশাই? আপনি কি শিব্রাম চক্রবর্তী? – আজ্ঞে। – আপনি…
-

রাবনা ব্রিজের অলৌকিক আঁধার
কোথায় যেন পড়েছি – ‘মৃত্যু মানুষের প্রেমকে অমরত্ব প্রদান করে, নান্দনিক ও মহিমান্বিত করে।’ কারো গল্প কিংবা উপন্যাসে হয়তো। শরৎচন্দ্রের কোনো লেখায় কি? হতে পারে, নাও হতে পারে। ঠিক মনে করতে পারছি না। শরৎবাবু তো বলেছেন – ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়’ – এই দূরে ঠেলে দেওয়াই কি মৃত্যু? হতে পারে,…
-

মথুরা পাখি
পাখিটাকে কেন যে তার বাসাতেই নিয়ে এসেছিল সেটা ভেবে কোনো কূল-কিনারা করতে পারেন না আরিফ সাহেব। তার রাত করে ঘুমানোর অভ্যাস। সকালে একটু দেরিতে ওঠেন। ভোররাতে দরজার বেল শুনে তাড়াহুড়া করে উঠে দরজা খুলতেই দেখেন একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা। মাথায় একটা গামছা বাঁধা। মুখে সাদা-কালো দাড়ি। হাতে একটা খাঁচা। তবে খাঁচার ভেতরে…
-

জ্যোৎস্নাবিভ্রম
শফিক মোটরবাইকটা সিঁড়িঘর থেকে বের করে উদ্বিগ্ন চিত্তে যখন গ্রিলে তালা দিচ্ছিল তখন আশপাশে কোথাও একটা রাতজাগা পাখির কাতর কণ্ঠ শোনা গেল। সে-সময় সে মনস্থ করে এবার বাসাটা বদলে শহরের ভেতর নিতে হবে। প্রায় এক বছর আগে এখানে যখন বাড়িভাড়া নেয় তখন একবারও ভাবেনি রাত-বিরাতে এমন বিপদ হানা দিতে পারে। সবচেয়ে ভালো হতো এই মুহূর্তে…
-

অথৈ পরমানন্দ
কে এই অথৈ পরমানন্দ? তাঁকে নাকি দেখা যায় না। ছোঁয়া যায় না। তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায় না। আসলে তিনি কে? তবে কি তাঁর চোখ আকাশের মতো নীল? তাঁর কেশ কি ঝুরিবটের মতো কাঁধ পর্যন্ত নামানো? তাঁর গায়ের রং কি সমুদ্রের মতো গাঢ় নীল? পাহাড়ের মতো তিনি কি ঋজু ও বলিষ্ঠ? তাঁর কণ্ঠস্বর কি সুললিত,…
-

গল্পহীনতার রাতগুলি
প্রায়ই এমন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন রাত্রিগুলি হাঁটতে থাকে। বড় বড় পাইপ … সড়ক থেকে অদূরে তার পাশেই ছাতাহীন জীর্ণ ঘর, এঁদো আঁশটে নর্দমার পাশেই শতছিন্ন কাপড় খাবলা খাওয়া মেঝেতে, তার ওপরই চিৎপাত পড়ে আছে গুগলু, পাশে কুকুরটা রাজকীয় হাই তুলছে, তার পাশেই একটা বাক্স, এর ভেতর থেকে সাপ এসে গুগলু যেনবা কোনো দেবতা তার কণ্ঠ পেঁচিয়ে মাঝেমধ্যে…
-

পথিক বনাম রাক্ষসরাস্তা
খাড়া! খাড়া! কেডা? কেডায় আমারে খাড়াইতে কয়? থপথপ করে হাঁটে ইসমাইল শেখ। মোটা থলথলে শরীরে হাঁটলে পথের ওপর পায়ের পদাঘাতে এক ধরনের বেঢপ শব্দ তৈরি হয়। মাঝবয়েসি ইসমাইল শেখ হাঁটছে আর আপনমনে বকে যাচ্ছে, মাগি তোরে আমি দেইখা লমু। কত্তো বড় সাহস তোর? আমার ঘরবাড়ি রাইখা তুই বাপের বাড়ি চইলা যাস? তোর পায়ের নলি যুদি…
-

অনন্ত বহে নিরবধি
ভাঙা পুকুর ঘাটটায় শ্যাওলা পড়ে গেছে। অর্ধেক তো নেবে গিয়েছিল গেল বর্ষাতেই। সমস্ত ঘরদোর ভেঙে আসছে। সামনের বর্ষাতে যা আছে তাও বোধহয় মিশে যাবে পুকুরপাড়ের সঙ্গে। সাত সকালে কিংবা মধ্য দুপুরে যখন-তখন ইটগুলো খসে খসে পড়ছে। কখন যে কার মাথায় গিয়ে লাগে, কখন কার করোটির ধার ভেঙে খুলির ভেতরে অনুপ্রবেশ করে – কে জানে! এক্ষুনি…
-

ধ্যানমগ্নতা
একা ঘরে কিংবা বাইরের নিরিবিলি পরিবেশে কে যেন প্রায়ই আমার সঙ্গে চুপিচুপি কথা বলে। বেশ মায়াজাগা কণ্ঠ, যদিও পুরোটাই বিভ্রম। যেমন আজো চুপ করে ঘরে বসে আছি। জানালা দিয়ে একফালি আলোয় অজস্র ধূলিকণা উড়ছে। অকস্মাৎ টের পাই কেমন খসখস শব্দ। বলি, ‘কে?’ – আমি। কী করছো? – ভাবছি। – কী? – জানি না, তবে ভাবনা…
