ছোট গল্প
-

জীবন মাঝির নৌকায়
কর্তার মেয়ে গয়না নৌকায় উঠলো। পাবনা মেন্টাল হাসপাতালের ঘাট। কেউ কেউ বলে, অনুকূল ঠাকুরের ঘাট। তাল ও খেজুর গাছের আট-দশ ফুট লম্বা কয়েকটা কাণ্ড একসঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে আপাতত ব্যবহারের জন্য, ছোট পদ্মার একটু উঁচু শুকনো পাড়ে, মাঝিরাই ঘাট তৈরি করেছে। আসল ঘাট ভেঙে গেছে। বন্যা বাড়তে পারে। দেশে যুদ্ধ হচ্ছে। শ্রাবণ মাস। এখন মেঘ…
-

অশেষ
এক মরণভাইটি যখন জীবনভাইয়ের একেবারে গা ঘেঁষে চলে যায়, ঠিক না ছুঁয়ে, তারপর আর জীবনের দিকে ফিরে তাকায় না কেন? যার কাছে এসেছিল অত তোড়জোড় করে, তাকে না পাওয়ার আক্রোশেই কি সে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে, লুকিয়ে থেকে মিটিমিটি হাসে আর তামাশা দেখে? ভাবখানা যেন, পারলে এসো না আমার কাছে! শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তো ধীরে ধীরে…
-

কাঁটা মেহেদি
ডাল বাগার দেওয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের মধ্যে। দেয়ালে দেয়ালে সে-গন্ধ প্রতিফলিত হয়ে পথ খুঁজছে বাইরে যেতে। রাসেলের গা গুলিয়ে ওঠে হঠাৎ। সংবাদটা শোনার পর থেকে সে দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি। অন্ধকারে কতবার চোখ মেলে তাকিয়ে থেকেছে, পাশ ফিরে মিলার নিশ্বাস পতনের ধ্বনি শুনেছে, তারপর এপাশে কষ্ট হলে অন্যপাশ ফিরে শুয়েছে। সকাল আটটা বাজে।…
-

শেখ সাবের লগে এক সকালে
ঘোর অন্ধকার। একে তো অজপাড়াগাঁ, তার ওপর পল্লিবিদ্যুতের আলো-আঁধারির লুকোচুরি। এই আসে, এই যায়। পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া থানার ছোট্ট এক গ্রাম। গ্রামের নাম গাজীপুর। একই নামে ঢাকার পাশের একটি জেলা থাকায় অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন। তাই কেউ কেউ গ্রামটিকে বলেন লোদের হাট। স্থানীয় এক হিন্দু ধনী পরিবারের অধিকর্তার নাম লোদমশাই। তাঁর নামেই এই ছোট্ট বাজারের নাম।…
-

শহীদ
সুতপা রোজকার মতো আজো ভোরবেলা উঠে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে পড়েছে বললে ভুল বলা হবে। সারারাত দু-চোখের পাতা সে এক করেনি। ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঘুম আসার মতো মানসিক অবস্থায় সে ছিল না। সত্যি বলতে কী, বিগত তিন সপ্তাহ ধরে ঘুম বলতে আসলে যা বোঝায়, তা হয়নি সুতপার। এমনি আরো কত রাত…
-

এই যে আঁধার
পশ্চিম আকাশের লালিমা মিলিয়ে অচিন্ত্যপুরে অন্ধকার নেমেছে একটু আগেই। সেখানকার একটি বাড়ির উঠোনজুড়ে তখনো একজোড়া পথভুলো চামচিকা বিক্ষিপ্ত উড়ে বেড়াচ্ছে। উঠোনের এক কোণে ঘ্যাচর ঘ্যাচর শব্দ করে সবিতা টিউবওয়েল চেপে কাদামাটি-মাখা পা ধুতে-ধুতে বারান্দায় বইপত্র ছড়িয়ে বসে-থাকা আট বছরের বোনঝি ছটুকে বলে, ‘ইট্টু পড়ে নে মন দিয়ে তারপর ভাত দেব।’ আজকে হাঁটাহাঁটিটা বড্ড বেশি হওয়ায়…
-

আড়খেয়া
সমুদ্রে জোয়ার ঠেলা দিতে নোনা জলের তোড়। সরু খালে সেঁধিয়ে পাঁক-কাদা হোড়ের নরম দেহ খোল বেয়ে আরো ঢেউ ফাঁপিয়ে নরনারীর আবাসের দিকে। কিংবা গন্ধে। মজা গাঙপাড়ে দখলি জায়গায় বাস্তু। সীমানায় তেতুল বাঁশবাগান। দু-চারখানা মোটা গেঁমুয়া, একলা কেওড়া, নয়তো পাতার খাঁজে খাঁজে সরু ডগায় কাঁটা সাজিয়ে তিন-চার হাত উঁচু হড়কোচ ঝোপ। ঝোপের গা ধরে একদা প্রবল…
-

মরণোত্তর বিলাপ
আমি মরতে চাইনি। তবু আমাকে ষড়যন্ত্র করে মেরে ফেলা হয়েছে! আমি ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আমগাছ, যে তার পাতার নিচে, ডালের নিচে, রোদ, আলো, ছায়ার নাচনের ভেতরে থিরথির কাঁপন লেগে থাকা দু-চোখ মেলে যুগের পর যুগ ছাত্রদের আন্দোলন, তাদের ভাষাসংগ্রাম, তাদের সংবিৎ, তাদের স্বাধীনতার সংকীর্তন চোখভরে, কখনো আনন্দে উদ্বেল, কখনো অশ্রুভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাকিয়ে দেখেছিল –…
-

মাজু খাতুন
সুধা চুপিচুপি শতদ্রুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন, ‘এই যে দ্রুভাই, তোমার দাদাভাই সারাবাজার চষেও খুঁজে পাননি তোমার নরেন মিত্তিরের রস।’ শতদ্রু তখন ঘুমের দেশ ছেড়ে ধীরে ধীরে তরী ভেড়াবে তীরে। সুধার কথাটা শুনে আচ্ছন্নের মতো বলে ওঠে সে, ‘আহা, বউমণি, দাদাভাইয়ের কি মাথা খারাপ হলো, বাজারে গেছে খুঁজতে, ওটা তো পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রিটে,…
-

ফ্ল্যাট নম্বর ৭/সি
রাজাবাজার তেরো নম্বর রোডে গিয়েছিলেন কখনো? যাননি মনে হয়। ওদিকের বাসিন্দা না হলে কে যায় ওই ঘিঞ্জি এলাকায়। কোনো অফিস-আদালত নেই, ভালো কোনো মার্কেট বা রেস্তোরাঁ নেই – কেন যাবেন? কখনো গেলে দেখবেন ওই রোডের মাথায় পানির পাম্পটির পাশেই একটি আটতলা বাড়ি। গেটের ওপর লেখা ‘একরাম ভিলা’। বাড়ির কোনায় একটি নারিকেল গাছ মরি মরি করেও…
-

ব্ল্যাকবোর্ড
পাঁচ ফুট উচ্চতার দেয়ালের ঠিক ওপাশে দু-জোড়া চোখ স্থির তাকিয়ে থাকে স্কুলভবনটির দিকে। তাদের দৃষ্টিতে গীতা মাসির চলে যাওয়ার অপেক্ষা। গীতা মাসি বড়নখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আয়া। প্রতিদিন সকাল নয়টার পর স্কুলে আসে, শিক্ষকদের বসার রুমের তালা খুলে রুম পরিষ্কার করে। রুমের সামনেই রঙ্গন ফুলের কয়েকটি কচি গাছ, প্রতীক্ষা করছে লালচে আলো ছড়ানোর। গাছগুলোতে প্রতিদিন…
-

অপূর্ব নিবিড় নিদ্রা
চেতনা ফিরে আসার সময়ে আমি দূরাগত কিছু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। প্রথমে মনে হয়েছিল, কেন মনে হয়েছিল জানি না, জলার ধারে একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে নিরুপদ্রব মুহূর্তে উচ্ছ্বসিত পাখিদের কাকলি। কিন্তু পরমুহূর্তে মনে হলো, না, এটা মানুষেরই কণ্ঠস্বর। তবে টেপ রেকর্ডারে ধারণ করা কথা ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে দিলে যেমন শব্দগুলো ভেঙেচুরে কিছু অর্থহীনতা ছড়িয়ে দেয়, অনেকটা সেরকম।…
